shibril_bogora_eid_chuti_1_24279যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে বিশ্বের ১০টি সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তালিকায় ৩ নম্বরে দেখানো হয়েছে। এ তালিকায় ১ নম্বরে আছে থাইল্যান্ডের বারিসান রেভুলুসি নাসিওনাল, দ্বিতীয় স্থানে আছে তালেবান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক তথ্য ও মতামত সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে পরিচিত আইএইচএসের ‘আইএইচএস জেনস ২০১৩ গ্লোবাল টেররিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি অ্যাটাক ইনডেক্স’ এই তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় ৪ নম্বরে ভারতের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ও ১০ নম্বরে নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নাম রয়েছে। খবর নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই সংস্থার একজন শীর্ষ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে। এই সংগঠনটিও একটি ভাড়াখাটা সংগঠন। বিপুল অর্থ আর রাজনৈতিক ফিটব্যাক পেলেই তারা এ ধরনের তালিকা প্রস্তুত করতে পারঙ্গম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা সব সংস্থার সাথে এর পার্থক্য অনেক।

আইএইচএস প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হামলা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০০৯ সালে সারা বিশ্বে মোট সাত হাজার ২১৭টি হামলার ঘটনা জানা যায়। আর ২০১৩ সালে এ হামলার সংখ্যা ১৫০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার ৫২৪টি। এসব হামলার ঘটনা পর্যালোচনা করেই এ সংগঠনগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি। তালিকার বাকি সংগঠনগুলো হলো ইরাকের আল-কায়েদা, সোমালিয়ার আল সাবাব, কলম্বিয়ার ফার্ক, ফিলিপাইনের নিউ পিপলস আর্মি, সিরিয়ার জাভাত আল নুসরা।

রিপোর্টটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে তালিকায় ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ৩ নম্বরে আনা হয়েছে তাতে অন্যান্য সব দলই আন্তর্জাতিক পরিম-লে কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কাজ ও নেটওয়ার্ক রয়েছে। রিপোর্টে স্টেটবিহীন বা কোন রাষ্ট্রের ঠিকানাবিহীন কিন্তু বিভিন্ন দেশে কর্মরত বলা হলেও শিবির বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায় কাজ করে না। এটা সবাই জানে। আইএসএস এর রিপোর্টটিতে এ বিষয়টি খুব কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তারাও বলেনি যে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন দেশে শিবিরের কাজ আছে। দ্বিতীয়ত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর তালিকায় শিবিরকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও শিবিরের কোন সশস্ত্র গ্রুপ নেই। বিগত ৫ বছরে ছাত্র অঙ্গনের যত সশস্ত্র হামলা ও হাঙ্গামার খবর ও ছবি ছাপা হয়েছে তাতে অস্ত্রহাতে বার বার দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে, ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নয়। এসব কারণে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ থেকে কাউকে কাউকে অইওয়াশমূলক বহিষ্কারও করতে হয়েছে। পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রলীগ কতৃক কুপিয়ে হত্যার মতো অজ¯্র ঘটনা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সেখানে ছাত্রশিবিরের দ্বারা এমন একটি ঘটনাও ঘটেনি। কাজেই সশস্ত্র গ্রুপ বা ক্যাডার সংগঠন বলতে হলে সেটা ছাত্রলীগকেই বলতে হবেÑ ছাত্রশিবিরকে নয়।

শিবিরের ইসলামী আদর্শভিত্তিক কিছু সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি তারা জাতীয় প্রয়োজনে রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করে থাকে। বিগত দুই বছরের তথ্য আইএসএস এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হলেও এই সময়ে শিবিরকে কেউ কোথায়ও অস্ত্রহাতে দেখেনি। এমন কোন খবর পত্রিকাতেও আসেনিÑকোন ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও এমন খবর আসেনি। বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনকালে মাঠে নামলেই শিবিরকে গুলী করা হয়েছে। শুধুমাত্র ২০১৩ সালেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হামলায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের অন্তত ৪৮ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। চলতি বছরের দেড় মাসে ৫ জন নিহত হয়েছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জেলখানায় আটকে রাখা হয়েছে। অনেককে গুম করা হয়েছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনকে আটক করে ৪৮ দিন রিমান্ডের নামে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে পঙ্গু করে এখনও জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এসব হামলার মোকাবিলায় শিবির কোন অস্ত্র ব্যবহার করেছে এমন খবর কোথায়ও আসেনি। দেশবাসী এসব জানে। তারপরেও এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশের উদ্দেশ কি তা কারো না বোঝার কথা নয়।

আইএসএস কোন অলাভজনক কল্যাণধর্মী সংগঠন নয়। জনকল্যাণে বিশ্বব্যাপী কাজ করা সংগঠনসমূহের তালিকায় তাদের নাম নেই। এটা একটি ভাড়াখাটা সংস্থা। যারা টাকা দেয় তাদের পক্ষে তারা কাজ করে দেয়। আলোচিত রিপোর্টটিও সে রকম একটি। এই সংগঠনের নির্বাহী সহ-সভাপতি (স্ট্রাটেজি, প্রডাক্ট এন্ড অপারেশন) সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তার নাম অনুরাগ গুপ্তা। তিনি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। এ ধরনের রিপোর্টের পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং প্রচারণা তিনিই করে থাকেন। শিবিরকে জড়িয়ে আলোচিত এই রিপোর্টটিও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রিপোর্টটি কত উদ্দেশমূলক তা বুঝা যায় তালিকার ৪ নম্বরে থাকা অনুরাগের নিজের দেশের সংগঠন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অপরাধের পরিসংখ্যান থেকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিগত ৫ বছরে এই সংগঠনের দ্বারা সশস্ত্র হামলা হয়েছে ২৩৬২টি। এতে নিহত হয়েছে ১৩৯১ জন যার মধ্যে পুলিশের সংখ্যাই ৪৬৯ জন। এরূপ একটি সন্ত্রাসী, সশস্ত্র ও গোপন সংগঠনকে তারা ৪ নম্বরে এনেছে। আর যাদের সশস্ত্র হামলার একটি নজীরও নেই তাদেরকে ৩ নম্বরে তালিকাভুক্ত করাতেই প্রমাণ হয় যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতা বা ন্যূনতম ভিত্তি নেই।

সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

Advertisements