21 Feb 1952(i) The firing by the police was necessary.
(ii) The force used by the police was justified is the circumstances of the case.
-হ্যাঁ, পুলিশের গুলি করাটা জরুরি ছিল! পুলিশ যে বল প্রয়োগের নীতি নিয়েছিল, পরিস্থিতি বিবেচনায় তা যৌক্তিকও ছিল!
পুলিশের গুলিতে বরকতের লাশ, রফিকের লাশ যাই পড়–ক না কেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিশের এস পি’র দেয়া নির্দেশে কোনো ভুল ছিল না। এছাড়া পুলিশ কিই বা করতে পারত!!
মাত্র ২৭ রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছিল!!
এসব সরকারি ভাষ্য। পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্য। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যে জনআন্দোলনের সূচনা করে, সেই নিরস্ত্র আন্দোলনকে মোকাবেলা করে তৎকালীন সশস্ত্র পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ। নির্বিচারে গুলি চলে। এই ঘটনার পর ১৯৫২ সালের ২৩ মার্চ একটি সরকারি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ২৭ মে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন পেশ করে। তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি টি.এইচ. এলিসকে (T. H. Ellis) তদন্ত কমিটির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিচারপতি এলিস তার ‘Report of the Enquiry into the Firing by the Police at Dacca on the 21st February 1952, by the Hon’ble Mr. Justice Ellis of the High Court of Judicature at Dacca.’ তদন্ত রিপোর্ট শেষ করেন এই বলে যে, পুলিশ যে গুলি চালিয়েছিল তা যথার্থ ছিল। যৌক্তিক ছিল। কুখ্যাত এলিস রিপোর্টের শেষ হয় এভাবে-
অনুচ্ছেদ ৫০- এই তদন্তের শেষ পর্যায়ে এসে আমি বিস্ময় প্রকাশ না করে পারছি না। আমি যা বুঝতে পারলাম, পূর্ব বাংলা পুলিশ বাহিনী স্টিলের হেলমেট দিয়ে সজ্জিত নয়। তাদের সম্বল কোনোভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো অল্প কিছু প্রাচীন এ.আর.পি হেলমেট। এটা অবিশ্বাস্য মনে হয় যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত একটি বাহিনীকে তাদের অভিযান পরিচালনা করতে হয় কাপড়ের টুপি পরে এবং ইট-পাথরের বৃষ্টির মুখে বিপর্যস্ত হতে হয়। অথচ ঢাকায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত থাকতে দেখা যায়। যদি জনাব ইদ্রিসের অধীনস্থ পুলিশ বাহিনী যথার্থভাবে অস্ত্রসজ্জিত থাকত, এটা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায় তাহলে এই তদন্তের কোনো উপলক্ষ কখনই তৈরি হতো না।
বিচারপতি টমাস হবার্ট এলিস তার বিচারে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে,
অনুচ্ছেদ ৫১- পরিশেষে, তদন্তকালে গৃহীত বিবৃতিগুলো (statements) বিবেচনা করে আমাকে অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে আসতে হয় যে,
(১) পুলিশের পক্ষে গুলি করা জরুরি হয়ে পড়েছিল (the firing by the police was necessary)
(২) পরিস্থিতির বিবেচনায় পুলিশ যে শক্তি প্রয়োগ করেছিল, তা ছিল বিবেচনাপ্রসূত এবং যৌক্তিক। (the force used by the police was justified in the circumstances of the case.)

২.
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে ছাত্র বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, তাতে নির্বিচারে গুলি চালায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পুলিশ। শহীদ রফিক, বরকত, জব্বারের রক্তস্নাত সেই ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। উর্দু নয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, এই জনদাবিকে উপেক্ষা করে পাকিস্তান সরকার। ভাষার দাবিতে জনলড়াই একসময় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে তীব্রতর করে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এই রক্তবর্ণন আজ বিশ্বস্বীকৃত। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র আন্দোলন দমাতে পুলিশের গুলিবর্ষণ ঘটনাকে জায়েজ করেন বিচারপতি এলিস। একটি গোপন শুনানির মাধ্যমে এই তদন্ত কাজ চলে। তদন্ত রিপোর্টের ১০ অনুচ্ছেদে বিচারপতি এলিস লেখেন ‘The hearing in camera should have commenced on the 7th April, 1952, but on that date it proved impossible to examine any witness as certain preliminary arrangements were not completed in time. The examination of witnesses actually commenced on the 8th of April.
(গোপন শুনানি শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৯৫২ সালের ৭ এপ্রিল। কিন্তু কিছু প্রাথমিক আয়োজন সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় ওই দিন সাক্ষীদের জেরা শুরু করা সম্ভব হয়নি। সাক্ষীদের জেরা করা শুরু হয়েছে মূলত ৮ এপ্রিল।)

৩.
পাকিস্তানের সরকারি এই তদন্ত কমিটিতে অনেকের সাক্ষ্য নেয়া হয়। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দেন আটজন কর্মকর্তা। যাদের অধিকাংশই ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় কর্মরত পুলিশের কর্মকর্তা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সুপার (এস পি) মোঃ ইদ্রিস ১ নম্বর সাক্ষী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস.এইচ কোরাইশি ২ নম্বর সাক্ষী, ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের ডি.আই.জি জনাব এ.জেড ওবায়দুল্লাহ ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেন। ষাটের অধিক সাক্ষীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, কলা অনুষদের ডিন ড. আই.এইচ. জুবেরী, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট ড. এম.এ গণি।
লক্ষ্য করার বিষয়, পুলিশের এস পি, ডি.আই.জি এবং ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিরস্ত্র জনতাকে নির্বিচারে গুলি করাকে যেমন সমর্থন করেন ঠিক তেমনি তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই তিন কর্মকর্তা ছাত্রজনতার পক্ষে শক্ত কোনো অবস্থান নিতে ব্যর্থ হন।

৪.
এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টের শুরুতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কি ঘটেছিল তার একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের একটি পাকিস্তানি ভাষ্য মেলে। ইতিহাসের নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ এই বয়ানে বলা হয়-
অনুচ্ছেদ ১- ‘৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ সালে ‘সর্বদলীয় কার্য কমিটি’র (অষষ-ঢ়ধৎঃু পড়সসরঃঃবব ড়ভ অপঃরড়হ) আদলে একটি কমিটি গঠন করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পূর্ব বাংলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া। এই কমিটি এই আন্দোলন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নেয় এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে ২১ ফেব্র“য়ারি ১৯৫২তে ব্যাপক বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় এবং একই দিনে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয়। ২১ ফেব্র“য়ারিতে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের অধিবেশনে বসার কথা ছিল এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলও একই দিনে একটি মিটিংয়ের আয়োজন করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এই মর্মে আশঙ্কা করেন যে, শহরে শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে। তিনি এই প্রেক্ষিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা অনুসারে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্ব অনুমতি ছাড়া সারা শহরে মিছিল, বিক্ষোভ এবং ৫ জন বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ২০ ফেব্র“য়ারি ১৯৫২, বিকেল ৫টায় আদেশ জারি করেন। সারা শহরে ঢোল পিটিয়ে আদেশটি প্রচার করা হয়। একটি প্রচার গাড়ি সারা শহরে মাইক্রোফোনের সাহায্যে এটি প্রচার করে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে এর অনুলিপি দেয়া হয়। যে কোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। ২১ ফেব্র“য়ারি ১৯৫২ এর সকাল ৭.৩০ এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। সকালে এক ঘণ্টার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে খবর আসে যে দোকানপাট বন্ধ করে, যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত করে ট্যাক্সি, রিকশা ও ভাড়াটে গাড়ি থেকে যাত্রীদের নামিয়ে হরতাল কার্যকর করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সারাদিন ধরে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পুলিশ বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটে সরাসরি গুলি করে। যার ফলশ্র“তিতে একজন ঘটনাস্থলে মারা যায় এবং তিনজন মারাত্মক জখম হয়ে পরবর্তীতে মারা যায়। মৃতদের মধ্যে আবুল বরকত নামে একজন ছাত্র ছিল।’

৫.
ঘটনার ৬২ বছর পর ভাষা আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক তদন্ত রিপোর্ট আমাদের সামনে অনেক ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। বলাবাহুল্য ভাষা আন্দোলন যে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে যাচ্ছে, তা বুঝতে অক্ষম হয় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত দুই পুলিশ কর্মকর্তা বিশেষত ডি.আই.জি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, এস.পি মো. ইদ্রিস এবং ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস.এইচ কোরাইশি যাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তারাও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বুঝতে পারেননি। এমনকি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের সূতিকাগার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি নতুন যুগের সূচনাপথে হাঁটছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচ্চপদস্থ তিনজন শিক্ষকও ভবিষ্যতের চোখে ইতিহাস দেখতে ব্যর্থ হন।
এই ঘটনার একটি বর্তমানিক তাৎপর্যও আছে। রাষ্ট্র তার জনগণের আকাক্সক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে অনাচার, দুরাচার, মিথ্যাচার করে সেই পাকিস্তানি ভূত এখনো বাংলাদেশের কাঁধ থেকে যায়নি। এখনো ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারি ভাষ্য পড়লে তা বিচারপতি এলিসের বয়ানের সহোদর বলেই মনে হবে।
প্রশাসনে যারা দায়িত্ব পালন করেন তারা এখন যেমন যে কোনো জনবিরোধী অন্যায্য ঘটনায় সরকারের পক্ষেই অবস্থান নেন, তখনও পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রশাসনের, পুলিশ প্রশাসনের এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তারা সরকারি জনবিরোধী অন্যায্য কাজের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। পরাধীন পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনের মনোভাবে জনস্বার্থে যে ন্যূনতম পরিবর্তন ঘটে নাই, এলিস কমিশনের রিপোর্ট পড়লে সেই সত্য আরও উদ্ভাসিত হয়।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : আরিফ খান ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিডিং ক্লাব। যাদের কল্যাণে এই ঐতিহাসিক রিপোর্টটির ইংরেজি কপি ও বাংলা অনুবাদ পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

১নং সাক্ষী
মি. মো. ইদ্রিস পিএসপি
সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (এসপি), ঢাকা
অনুচ্ছেদ ৩৪ : কোন পরিস্থিতিতে জনাব ইদ্রিস গুলি ছোঁড়া
শুরু করেন তা নিয়ে তাকে নিচের প্রশ্নগুলো করা হয়
প্রশ্ন নং ৭৫- এখন নির্বিচার লাঠিচার্জের বিষয়ে ফিরে আসি। আপনি কি মহামান্য আদালতকে লাঠিচার্জ এর ফলে কি হয়েছিল বলতে পারেন?
উত্তর : লাঠিচার্জ পুরোপুরি বিফল হয়েছিল। ছত্রভঙ্গ হওয়ার পরিবর্তে ও ইট-পাটকেল ছোঁড়া বন্ধ করার বদলে তারা বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসছিল। প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের কোণার দিক ও মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের দিক থেকে আসছিল।
প্রশ্ন নং ৭৬- এইসব দিক থেকে আসা আন্দোলনকারী সংখ্যা কত হবে বলে আপনার ধারণা?
উত্তর : ৫ থেকে ৬ হাজার।
প্রশ্ন নং ৭৭- সে সময় উপস্থিত পুলিশের জনবল কেমন ছিল?
উত্তর : সেখানে সেসময় তিনজন প্রধান কনস্টেবল, ৩০ জন সশস্ত্র কনস্টেবল, দুইজন প্রধান কনস্টেবল এবং নিরস্ত্র বাহিনীর ১৪ জন কনস্টেবল এবং একজন প্রধান কনস্টেবলসহ ১৪ জন গ্যাস স্কোয়াডের কনস্টেবল; একজন ইন্সপেক্টর এবং দুজন সার্জেন্ট ছিলেন।
প্রশ্ন নং ৭৮- যখন জনতা এগিয়ে আসছিল, আপনি বলছেন যে লাঠিচার্জ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, আপনি মহামান্য আদালতকে বলবেন কি, সে সময় আপনি কী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিবেচনায় নিয়েছিলেন?
উত্তর : জনতা বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসছিল। এবং আমি সশস্ত্র বাহিনীকে সেখানে অবস্থান নেওয়ার আদেশ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়ে যে, চারপাশ থেকে আমাদের প্রায় ঘেরাও করে ফেলা হয়েছিল। এবং আমরা আক্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। তখন আমি সেখানে উপস্থিত ডি.এম. এবং ডি. আইজি-এর সঙ্গে পরামর্শ করলাম। আমরা সবাই মিলে গুলি করার সিদ্ধান্ত নেই।
প্রশ্ন নং ৭৯- আপনি কি আদালতকে বলতে পারেন আপনি কিভাবে গুলি চালিয়েছিলেন এবং কার নির্দেশে?
উত্তর : আমার কমান্ডে গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। আমি আমার সৈন্যদের ৫ জন করে এক একটি দলে ভাগ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের কোণায় এবং মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের পাশে অবস্থান নিতে বললাম। আমি আমার উভয় দলের সৈন্যদের এক রাউন্ড করে গুলি ছুঁড়তে নির্দেশ দিলাম। তারা তাই করল। বিক্ষুব্ধ জনতা যারা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের নিকটে ছিল এবং মাঠের কোণায় ছিল তারা পিছু হটল এবং আমি একজন লোককে সেখানে পড়ে থাকতে দেখলাম। কিন্তু মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের পাশের জনস্রোত ক্ষণিকের জন্য পিছু হটলেও পুনরায় প্রচণ্ডভাবে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসছিল। আমি ৫ জনের একটি দলকে একযোগে গুলিবর্ষণ করার নির্দেশ দিলাম। যখনই বিশৃঙ্খল জনতা পিছু হটতে শুরু করল তখনই আমি তাদের থামতে নির্দেশ দিলাম। আমি আদেশ করলাম, ‘গুলি থামাও’ এবং তারপরই যখন গোলাবারুদ পর্যবেক্ষণ করলাম তখন লক্ষ্য করলাম যে ২৭ রাউন্ড গুলি করা হয়েছিল।
প্রশ্ন নং ৮০- গুলিবর্ষণ করার পূর্বে বিশৃঙ্খল জনতাকে কি সতর্ক করা হয়েছিল?
উত্তর : ‘হ্যাঁ, আমরা তাদের বারবার সতর্ক করেছিলাম।’
প্রশ্ন নং ৮১- কে সতর্ক করেছিল?
উত্তর : আমরা সবাই।
প্রশ্ন নং ৮২- সবাই বলতে আপনি কাদের বোঝাতে চাচ্ছেন?
উত্তর : ডি.আই.জি, ডি.এম এবং আমি নিজে সবাই তাদের সতর্ক করেছিলাম। এরপর আর কোনো উপায় না দেখে গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল।

২নং সাক্ষী
মি. এস.এইচ কোরাইশি
ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডি.এম), সিএসপি
অনুচ্ছেদ ৩৫ : ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটও (সাক্ষী নং ২)
একইভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হন
প্রশ্ন নং ৫৯- আনুমানিক বিকাল ৩টার সময় ক্রসিং এর আশপাশে জড়ো হওয়া বিশৃঙ্খল জনস্রোতে কি পরিমাণ লোক ছিল?
উত্তর : জনস্রোত ছড়িয়ে পড়েছিল এতে প্রায় ৫ হাজার লোক ছিল।
প্রশ্ন নং ৬৩- কার কমান্ডে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছিল?
উত্তর : আমার আদেশে (ঙৎফবৎ) ও এসপির নির্দেশনায় (ঈড়সসধহফ)।
প্রশ্ন নং ৬৪- আপনি কি জানেন কোন দিক থেকে গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছিল?
উত্তর : বিক্ষোভকারীদের দুই অংশের উপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। তাদের এক অংশ অবস্থান করছিল হাসপাতালের গেটের দিকে ও ক্রসিংয়ের সামনে এবং অপর অংশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনের রাস্তা ও গেটের সামনে।
প্রশ্ন নং ৬৫- আপনি কি জানেন কত রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছিল?
উত্তর : গুলিবর্ষণ শেষ হবার পরে আমাকে বলা হয়েছিল যে সর্বমোট ২৭ রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, দুই এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ার পর গুলিবর্ষণ বন্ধ করা হয়েছিল। এটা দেখার জন্য যে, তা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল কি না। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তারপরও সামনে এগিয়ে আসছিল।
প্রশ্ন নং ৬৬- কার নির্দেশে গুলিবর্ষণ বন্ধ করা হয়েছিল? আপনার না এস.পির?
উত্তর : এস.পির নির্দেশে বন্ধ করা হয়েছিল। এছাড়াও দুইএক রাউন্ড গুলি করা হয়েছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে ২৭ রাউন্ডের বেশি হবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশাসনের পক্ষে সাক্ষ্য
ড. আই. এইচ. জুবেরী
ডিন, কলা অনুষদ এবং বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইট-পাটকেল সম্পর্কে ড. জুবেরী (সাক্ষী নং-৩৭)কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়-
প্রশ্ন নং ১৪০- আপনি যদি লক্ষ্য করে থাকেন তবে মনে করার চেষ্টা করুন যে, যখন গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছিল তখন কি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে কোনো প্রকার ইট-পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছিল? পুলিশ এবং তাদের জিপে কি আঘাত করা হয়েছিল?
উত্তর : যখন গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল, আমি মনে করি না তখন কোন ইট-পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছিল।
প্রশ্ন নং ১৪১- তারপর?
উত্তর : কিন্তু টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করার পর পুলিশ উপাচার্যকে অভিযোগ করল যে, ইট-পাটকেল ছোঁড়া হচ্ছে।
প্রশ্ন নং ১৪২- মাননীয় উপাচার্য কর্তৃক কি কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যে ইট-পাটকেলগুলি রেলিং এর ভেতর থেকে ছোঁড়া হচ্ছিলো কিনা?
উত্তর : আমি মনে করি না যে, মাননীয় উপাচার্য এটার জন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু আমি মনে করি কিছু ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়েছিল। আমি রেলিংয়ের বাইরে ছিলাম। আমি ছাত্রছাত্রীদের এটা থেকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিলাম। আমার এটা ভালো মনে আছে।

উল্লেখযোগ্য সাক্ষী
অনুচ্ছেদ ১৮ : দেখা যায়, এই তদন্তের ক্ষেত্রে যাদের সাক্ষ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ
তারা হলেন ৮ জন অফিসিয়াল সাক্ষী। এর মধ্যে ৬ জন পুলিশ কর্মকর্তা

নাম সাক্ষী নম্বর
ছ’জন পুলিশ কর্মকর্তা
জনাব মো. ইদ্রিস, পি. এস. পি., এস. পি. ঢাকা ১
জনাব এ. জেড. ওবায়দুল্লাহ ডি. আই. জি. ঢাকা রেঞ্জ ৩
জনাব মো. সিদ্দিকী দেওয়ান, ডি.এস.পি, সিটি ঢাকা ৪
জনাব মোহাম্মদ ইউসূফ, স্পেশাল সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশ
আই. বি. ইস্ট বেঙ্গল, ঢাকা ৮
জনাব আব্দুল গোফরান, তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, লালবাগ থানা
জনাব মীর আশরাফুল হক, পুলিশ ইন্সপেক্টর গোয়েন্দা বিভাগ, ঢাকা ১০
দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট
এস. এইচ. কোরাইশি, সি.এস.পি. জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা ২
নুরুদ্দিন আহমেদ, এস. ডি. ও. সদর দক্ষিণ ঢাকা ৫
নন-অফিশিয়াল সাক্ষী-
মো. কামাল এম. এ ২৮
দেওয়ান হারুন মো. মনিরউদ্দিন ৬৪
মূলত এই সাক্ষীরাই পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে বলে দাবি করেছেন।

লেখক: শুভ কিবরিয়া
উৎসঃ   সাপ্তাহিক

Advertisements