Upozila Electionউপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফার ফলাফলে চমক দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিগত দিনে নানা দিক থেকে কোনঠাসা ধর্মভিত্তিক এ দলটির রীতিমতো উত্থান ঘটেছে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে। বিষয়টি নিয়ে সবখানেই সরব আলোচনার পাশাপাশি ভাবিয়ে তুলছে প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। বিশেষ করে চরম অস্বস্থিতে আছে সরকার ও সরকারের শরীক বামপন্থী রাজনীতিকরা।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা এবং যুদ্ধাপরাধে জড়িত অভিযোগে গত কয়েক বছরে জনগণের মধ্যে তীব্র জামায়াতবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে। এর মধ্যে দলটির অন্যতম নীতিনির্ধারক বলে খ্যাত আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে দলটির নেতা কর্মীরা। প্রথম, দ্বিতীয় সারির সব নেতাই বলতে গেলে বিভিন্ন মামলায় জেলে আটক আছেন। তৃতীয় সারির নেতরাও জেলে অথবা পলাতক আছেন। আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেযার অধিকারও হারিয়েছে জামায়াত। এতকিছু সত্ত্বেও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাথে পাল্লা দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থান করে নিয়েছে দলটি। আর ভোট ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হিসেবে রীতিমতো ছাড়িয়ে গেছে দশম সংসদের প্রধান বিরোধীদলে থাকা দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে।

গত বুধবার প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত ৪০ জেলার ৯৭ উপজেলার ৬৩টিতে পারজিত হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন ৫৬ জন। গত নির্বাচনে এই ৯৭টি উপজেলার মধ্যে বিএনপির ১৪ ও জামায়াতের ৮ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে জিতেছিলেন। আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান ছিলেন ৬৬ জন।

বিস্তারিত ফলাফলে দেখা যায়, ৯৭টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপি সমর্থিত ৪৩ জন (দুইজন বিদ্রোহীসহ), আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৩৪ জন (একজন বিদ্রোহীসহ), জামায়াত সমর্থিত ১৩ জন, ইউপিডিএফ দুইজন, জাতীয় পার্টি একজন, জনসংহতি সমিতি সমর্থিত একজন এবং স্বতন্ত্র দুইজন বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ৩২ জন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ২৪ জন, জামায়াত সমর্থিত ২৩ জন, স্বতন্ত্র ছয়জন, জাতীয় পার্টি তিনজন এবং অন্যান্য চারজন। বাকিগুলোর ফল পাওয়া যায়নি। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি সমর্থিত ৩৪ জন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৩৪ জন, জামায়াত সমর্থিত ১০ জন, স্বতন্ত্র সাতজন, জাতীয় পার্টির একজন এবং অন্যান্য তিনজন জয়ী হয়েছেন।

ফলাফলে অতীতের চেয়ে অনেক ভালো করেছে জামায়াত। এই দল সমর্থিত ১৩ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৩ জন, এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১০ জন বিজয়ী হয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে যে জামায়াতের অস্তিত্ব নিয়েই অনেকে সন্দিহান, সেখানে উপজেলা নির্বাচনের দৌড়ে সেই জামায়াতের এত অর্জন রীতিমতো বিস্ময় ঠেকছে অনেকের কাছেই।
এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বগুড়া জেলার তিনটি উপজেলায় জামায়াতের তিন প্রার্থী বিশাল ব্যবধানে বিএনপিকে হারিয়ে দিয়ে জয়লাভ করেছে।

বগুড়া ছাড়াও সিলেট যশোর ও ঝিনাইদহসহ আরো সাত উপজেলায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। বিভিন্ন স্থানে শুধু বিএনপিকেই নয়, একইভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীদেরকেও ৬০/৭০ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছেন জামায়াত প্রার্থীরা।

নির্বাচনে এবার জামায়াতের চমকের মধ্যে রয়েছে যে, তারা কেবল দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায়ই সাফল্য পায়নি। বরং এর বাইরেও নতুন নতুন এলাকায় জয় ছিনিয়ে এনেছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিজ বাড়ি আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শশুরবাড়ি রংপুরের যে দুটি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার একটিতেও এবার জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। আর অন্যটিতেও জিততে পারেনি আওযামী লীগ বা জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। সেটা দখলে নিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

এদিকে, জামায়াত বেশি পদে জয় পেয়ে দেশে ভোটারদের মাঝে তাদের শক্ত অবস্থান জানান দিলেও এবার বেশি পিছিয়ে পড়েছে জাতীয় পার্টি। এরশাদের নেতৃত্বাধীন এ দলটি বুধবারের নির্বাচনে সারা দেশ থেকে স্থানীয় সরকারপ্রধান হিসেবে পেয়েছে মাত্র একজন প্রতিনিধি, তাও আবার রংপুর থেকে নয় বরং গাইবান্ধা থেকে।
কেবল জাতীয় পার্টিই নয়, অনেক স্থানেই বহু দিনের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান হিসেবে গোপালগঞ্জ বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে গত বুধবার গোপালগঞ্জের যে দুই উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এর একটিতে হেরে গেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। জেলার মোকসেদপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকে একসঙ্গে হারিয়ে দিয়ে জয়লাভ করেছেন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের এই হারের পেছনেও জামায়াত কাজ করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তা হলো ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনার কথা বলে বাম যে সব সংগঠন বিভিন্ন ইস্যুতে সরব, উপজেলো নির্বাচনে তাদের একেবারে দীনহীনতা। দশম সংসদে একাধিক এমপি থাকলেও উপজেলায় একজন চেয়ারম্যান পদেও জয় পায়নি সরকারের অন্যতম শরীক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন অর্জন নেই কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য বাম দলগুলোরও। তবে, উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের ফল লাভে উষ্মা প্রকাশ করে জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, জামায়াতকে জনগন কেন ভোট দেয়, তা তার জানা নেই।

নানা বিশ্লেষণে যদিও বলা হচ্ছে, প্রার্থী বাছাইয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক ভুল থাকায় জামায়াত তার সুফল ঘরে তুলে নিয়েছে। তবে কেবলই কি তাই নাকি, আছে অন্য কিছু, এসব নিয়ে চলছে চুলচেড়া আলোচনা ও বিশ্লেষণ।
তবে, জামায়াত নেতাদের দাবি, সরকার শত চেষ্টা করেও তাদের দল ও নেতাদের জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং জুলুম নিপীড়ন চালিয়ে সরকারই জনবিচ্ছিন হয়ে পড়েছে। সুযোগ পেলে আগামীতেও জনগণ এর প্রমাণ দেবে বলে মনে করে জামায়াত।

সূত্র: নিউজপেজ২৪

Advertisements