TuhinMalikবাংলাদেশের সংবিধানের সবচেয়ে ছোট অনুচ্ছেদটি হচ্ছে অনুচ্ছেদ ৩। তিনটি মাত্র শব্দের সমন্বয়ে এই অনুচ্ছেদটি গঠিত। যেখানে বলা হয়েছে_ ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু তা হলে হবে কি, আমাদের উচ্চ আদালতে একচ্ছত্র শাসন চলছে ইংরেজিরই। অথচ যে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি লাভ করেছে, মহান ভাষা আন্দোলনের সেই দেশের উচ্চ আদালতে আজও স্বীকৃতি পায়নি বাংলা ভাষা। যেখানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বলে সংবিধান স্বীকৃতি দিয়েছে সেখানে সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের অধীনে গঠিত হয়েও সংবিধানের বাইরে থাকবে কেন? তাহলে সুপ্রিমকোর্টর্ রাষ্ট্রের বাইরে, না রাষ্ট্রের ভেতরে? দেশের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ বা সংসদ বাংলায় চললে বিচার বিভাগের উচ্চ আদালতে বাংলা থাকতে অসুবিধা কোথায়? যেখানে আমরা রাষ্ট্রের গণ্ডি ছেড়ে বহু দূরে গিয়ে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবে বাংলা চালু করার দাবি জানাই, অথচ নিজ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বাংলা চালুর হিম্মত দেখাতে পারি না! আশ্চর্য যে জাতি ভাষার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলেছে সেই দেশের উচ্চ আদালতে বাংলা পরবাসী! প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা বাংলার জন্য আপ্লুত হয়ে পড়ি। আমাদের প্রতিবেশী মাদ্রাজ হাইকোর্টে তামিল ভাষা প্রচলনের দাবিতে যেখানে অনশন পর্যন্ত হয়েছে সেখানে আমাদের দেশে অনশন তো দূরের কথা আজ অবধি এ নিয়ে কোনো সমাবেশও হতে দেখিনি।

আদালতে নিজের ভাষার দাবিটা শুধু ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্যই নয়। বরং নিজের ভাষায় রায় পাওয়ার স্বতঃসিদ্ধ অধিকার প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। ফাঁসির আসামি বুঝতেই পারল না কেন তার ফাঁসি হলো! ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪(৩) দফায় বিচারপ্রার্থীর বোধগম্য ভাষায় বিচার পাওয়ার অধিকার মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ১৩ বছর আগে বাংলাদেশও এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু নিজ দেশের উচ্চ আদালতে তা বাস্তবায়ন না করে বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক আইনটিকে লঙ্ঘন করে চলছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ৩ নং অনুচ্ছেদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। নিম্ন আদালতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাই চালু ছিল। কিন্তু হামিদুল হক চৌধুরী, যিনি মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলা ভাষাবিরোধী ছিলেন, আশির দশকে দেশে ফিরে হাইকোর্টে এর বিরুদ্ধে মামলা করলে আদালত তার পক্ষে রায় দেন। তখন নতুন করে নিম্ন আদালতে ইংরেজি চালু হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদের সময় বাংলাদেশের সব অফিস-আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করার জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করা হয়। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা, প্রচলন আইনে বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতে সওয়াল জবাব এবং আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উলি্লখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহলে তা বেআইনি বা অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’ এই আইন জারির পর আমাদের সব আদালতে বাংলা ভাষায় বিচারকার্য শুরু হয় এবং বাংলা ভাষায় সব অফিসের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু শুধু ব্যতিক্রম ঘটে আমাদের সুপ্রিমকোর্টে। ওই সময় এই আইনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্টে একটি মামলা হয়। ওই মামলাটি বিখ্যাত হাসমতুল্লাহ বনাম আজমেরি বেগমের মামলা। ১৯৯১ সালে এই মামলায় সংবিধানে স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা থেকে আদালতের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট একটি বাংলা ভাষাবিদ্বেষী রায় দেন। যেখানে সুপ্রিমকোর্টর্ স্বয়ং সংবিধানের অধীনে, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন বিধি যেখানে অসংঘর্ষপূর্ণ ও বাতিল সেখানে এই রায়ের মাধ্যমে তিন ধরনের ভাষার উদ্ভব ঘটানো হয়। রাষ্ট্রভাষা, সরকারি ভাষা ও আদালতের ভাষা হিসেবে তিনটি ভাষাকে সংজ্ঞায়িত করে আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটি সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদের আওতায় প্রণীত। উচ্চ ও নিম্ন আদালত বলতে এই আইনে কোনো তফাৎ নেই। কিন্তু এই মামলার রায়ে যেভাবে বলা হলো এই আদালত বলতে নিম্ন আদালতকেই বোঝানো হবে, উচ্চ আদালতকে নয় সেটা একেবারেই অযৌক্তিক। কারণ আমাদের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আদালতের ব্যাখায় যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে কিন্তু নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত বলতে কোনো পার্থক্য দেওয়া হয়নি। আদালত বলতে সব আদালতকেই বোঝানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো_ নিম্ন আদালত যদি বাংলা ভাষায় চলতে পারে, তাহলে উচ্চ আদালতে কেন ভিনদেশি ভাষা হবে? ইংরেজিকে বাংলায় রূপান্তর করে স্বদেশী ভাষার প্রয়োগ করাই এখানে বেশি সমীচীন। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার যথার্থ প্রয়োগ ও প্রচলন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। কারণ প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রয়েছে তার রায়টা বোঝার। যদি তার রায় বোঝার অধিকারকে ভাষা দিয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয় তাহলে এটা পরিষ্কার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

খুবই আশ্চর্যের বিষয় যেখানে আমাদের সুপ্রিমকোর্টর্ বাংলা ভাষার বিকৃতি ও ভাষা দূষণ বিষয়ে রুল জারি করে বলেন ‘পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা যার জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি নাই। সুতরাং এই ভাষার পবিত্রতা আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ অথচ এই সুপ্রিমকোর্টেই বাংলা নেই কেন? উচ্চ আদালতে ভাষার দাবিতে গোটা বিশ্বেই এখন জনমত প্রবল। ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট স্পষ্টতই বলেন, বিচারপ্রার্থীর বোধগম্য ভাষাতেই বিচার পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে। একান্তই সম্ভব না হলে সেটার অনুবাদ তাকে করে দিতে হবে। তাদের সংবিধানেও অভিযুক্তের বোধগম্য ভাষায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কানাডার উচ্চ আদালতের সব রায় ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় ছাপানো বাধ্যতামূলক। মালয়েশিয়ার সংবিধান ও জাতীয় ভাষা আইনে আদালতের সব রায় তাদের বাহাসা ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক। তা ছাড়া সোভিয়েত রাশিয়া, জার্মানি, চীন, ফ্রান্স, জাপান এমনকি আমাদের পাশর্্ববর্তী দেশ নেপালেও তাদের নিজেদের ভাষায় আদালত চলে।

আসলে বাংলায় বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির। সংবিধানের ৯৫(গ) অনুচ্ছেদে ছোট একটি সংশোধনী এনে বিচারকদের বাংলায় রায় লিখতে পারার যোগ্যতাকে সনি্নবেশিত করতে হবে। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৮ ধারা সংশোধন করে আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে হাইকোর্ট রুলসের ইংরেজিতে দরখাস্ত লেখার বিধানকে পরিবর্তন করে বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। একান্তই ইংরেজিতে রায় দিলেও তার বাংলা অনুবাদের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এগুলো আমাদের দাবি নয়, আমাদের অধিকারও বটে। ইংরেজিপ্রীতি দোষের কিছু নয়, কিন্তু তা কখনো বাংলা নিধন করে নয়।

তুহিন মালিক
লেখক : সুপ্রিমকোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯/০২/২০১৪
Advertisements