Islami_Bank_Bangladesh_logo২০০৮ সাল থেকে চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের উপর তেমন না পড়লেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশী অভিবাসীদের সুবাদে এবং আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সুবাদে আমাদের সাধারণ মানুষ তা অবগত আছেন। সে মন্দা উত্তরণে নেয়া কৌশল ও ফলাফল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে সেখানে। খ্যাতিমান নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল-ক্রগম্যান তার ‘ইউরোপের মহা বিভ্রান্তি’Ñ শীর্ষক প্রবন্ধে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলম্যান্ট এ প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে বলেছেন- ‘আপনাকে অবশ্যই বুঝতে হবে, আপনি বিকল্প এক বিশ্বে প্রবেশ করেছেন, যেখানে ইতিহাসের শিক্ষা কিংবা গাণিতিক নিয়ম কাজ করছে না। এ বিশ্বে কাজ করতে পারে কেবল কঠোর আত্মসংযম, এতেও কথা রয়েছে। প্রত্যেকেরই ব্যয় কমাতে হবে দীর্ঘশ্বাস না ছেড়েই। তবেই কেবল আশা করা যায়, আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার। নইলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটার সম্ভাবনা নেই।’

ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলম্যান্ট এ পল-ক্রগম্যান যা বলেছেন সে কথাটিই একটু বেরসিকভাবে উপস্থাপন করেছেন প্রাচ্যের আধুনিক স্ট্যাটম্যান মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেছেন পাশ্চাত্যকে এখন স্বীকার করতে হবে ‘আমরা দরিদ্র’ হয়ে গিয়েছি। পল-ক্রগম্যান যে ব্যয় কমানোর কথা বলেছেন তুষ্ট মনে ভোগেচ্ছাকে পরিত্যাগ করে এবং ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলম্যান্ট যে আত্মসংযমের কথা বলেছেন তা কেবল তখনই সম্ভব যখন একজন মানুষ ভাবতে সক্ষম হয় যে তার আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এটিই সাবলীল ভাষায় ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন। তবে যে বিষয়টি বলার জন্য আমরা এ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছি তা হলো আত্মসংযম বা ব্যয় কমানোর বিষয়টি সাময়িক সমাধান মাত্র, যেখানে সমস্যাটি সর্বব্যাপী গুরুতর ও ক্রণিক।

আসলে ওয়াল স্ট্র্রীটে যা ঘটেছিল তা শুধু অর্থনৈতিক নীতি কৌশলের ব্যত্যয়ের বিষয় ছিল না। সেখানে অর্থব্যবস্থার অন্তর্গত দর্শনের অসঙ্গতি ছিল মূল বিষয়। পাশ্চাত্য তা স্বীকার করুক আর নাই করুকÑ এটাই প্রকৃত বাস্তবতা।

পাশ্চাত্য পুঁজিকে অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে তার সুরক্ষার নিমিত্তে যে নিরাপত্তা আবশ্যক তা ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। বাম দর্শনের ভাষায় পুঁজি তার নিরাপত্তার জন্য কখনও অবৈধ গর্তে ঠুকতে দ্বিধা করে না। অপরদিকে ইসলামী দর্শন অনুযায়ী পূঁজির প্রতি মানুষের আকর্ষণ দুর্দমনীয়।

পূঁজির অস্বাভাবিক স্ফীত হবার কারণে সেখানে দু’ধরনের ক্ষত তৈরি হয়েছিল। তার একটি হলো পুঁজির চতুর পার্শে¦র মানুষগুলোর যে লোভ তা স্বাভাবিক পর্যায় অতিক্রমে প্ররোচনা যুগিয়েছিল, যার ফলে সেখানে অবৈধ সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছিল যা দিয়ে সীমাহীন Siphoning সম্ভব হয়েছিল। অথচ এই অবস্থা রোধকল্পে কোন নৈতিক পরিশোধনের বা Filtering এর ব্যবস্থা ছিল না। অন্যদিকে পুঁজির এই স্ফীতি পাশ্চাত্যের একটি শ্রেণীর আয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধহীন ভোগবাদী যন্ত্রে পরিণত করেছিল যার উপর দিকটিই শুধু সেখানে পজিটিভলি নেয়া হয়েছিল আর অন্তর্নিহিত দিকটিকে উপেক্ষা করা হয়েছিল চরমভাবে। মার্কিন কনজিউমারকে সে ভাবেই বিবেচনা করা হয়েছিল।

মানুষের নৈতিকতার এ ক্ষত দু’ভাবে আর্থ- সামাজিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একটি যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। অতি বা সর্বগ্রাসী লোভে  Siphoning এর পথ খুলেছিল। অন্যটি হলো নিজেদের লোভ চরিতার্থ করতে ভুল ও বিপর্যয়কর কর্ম পদ্ধতি অবলম্বন করে অনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবার পথ প্রসারিত করেছিল। যা আমরা ল্যাহম্যান ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করেছি।

দ্বিতীয় যে ক্ষত সেখানে তৈরি হয়েছে তা হলো স্ফীত পুঁজির ফলকে সুবণ্টিত হবার পথকে রুদ্ধ করা। এটা অনস্বীকার্য যে, অর্থ বণ্টনের বৈষম্য এতটা তীব্র এর আগে সম্ভবত কখনই হয়নি। দর্শনগত এই অবচ্যুতি পাশ্চাত্যের দৃষ্টিশীলদের  একেবারেই দৃষ্টি অগোচরে থেকে গেছে, তা নয়। তাই আত্মসংযমের কথা এসেছে। এসেছে বাজারের নৈতিক মূল্যবোধের কথা। কিন্তু সামগ্রিক নৈতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে তা কি করে সম্ভব? পুঁজির সুঘ্রাণ মনুষ্য নাসিকাগ্রে মৌ মৌ করে ঘুরে বেড়াবে। আর মানবিক মূল্যবোধহীন ও অনির্বারিত (Unfiltered)   লোভ সেখানে নিষ্ক্রিয় থাকবে তা মানব প্রকৃতির পরিপন্থিই বটে।

দর্শনগত এই অবচ্যুতির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসে তা মানবেতিহাস বার বার মেনে নিতে পারে না। হাজার হাজার ব্যাংক বন্ধ হবে। অসংখ্য লোক চাকরী হারাবে, গৃহহীন হয়ে পড়বে, ২৯-৩০ সালে যা হয়েছে তা আবার ২০০৮ থেকে ১৩ সালে হবে অথচ আমরা আধুনিক উত্তরাধুনিক দাবি করব তা কি করে হয়? অবশ্যই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে যোগোপযোগী সমাধান। পুঁজির নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই ব্যবস্থাগ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে পুঁজি এমন বিষয় তাকে শুধুই পাহারাদার বসিয়ে, নানাবিধ নিয়মের জালে ফেলে নিবিড় তদারকী করেই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। তাহলে তার সুরক্ষার জন্য কি করা প্রয়োজন?

০        যতদুর সম্ভব পুঁজিকে অস্ফীত রেখেই কর্মে বিনিয়োজিত করা।

০        বণ্টন ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে পুঁজির ফল সমাজের উচ্চ শ্রেণীর প্রতি Up word  না হয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি   Up word  হয়।

০        পুঁজির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বা লোভ দুর্দমনীয়। মানুষের জন্য তার লক্ষ্য অর্জনে লোভ থাকা জরুরি। কিন্তু তার লোভকে সীমাহীন করে তোলার সব পন্থা বন্ধ করা উচিত। এবং এটা যান্ত্রিক বা অযান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেই সম্ভব না। তাকে মানবিক ও নৈতিক বোধ সম্পন্ন রাখার কার্যকর কৌশল অবলম্বন জরুরী।

০        পুঁজির ব্যবহারকে সমাজের সকল শ্রেণীর কল্যাণ বিবেচনায় কাজে লাগানো। এ ব্যাপারে মুসলিম চিন্তাবিদ আল্লামা শাতেবীর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। তা হলো পুঁজিকে কাজে লাগাতে হবে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের তিনটি স্তরকে বিবেচনায় রেখে।

১. জরুরীয়াত বা আবশ্যক।

২. হাজিয়াত বা প্রয়োজন।

৩. তাহাস্সানিয়াত বা উত্তম বিবেচনাবোধ।

সুদ যেহেতু মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগস্ত করে তাই তার বিকল্প অনুসন্ধান জরুরী। তাছাড়া আয় বৈষম্য তৈরীতে সুদ চালিকার ভূমিকা পালন করে। আমাদের কাছে সর্বশেষ যে খবর আছে তাতে দেখা যাচ্ছে ২০০৯ সালে সবচেয়ে মন্দার আঘাতকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষেরই কোন আয় নেই। (Most people have had no going since the economy hit bottom in the 2009)

Russel Foundationএর প্রেসিডেন্ট Seldon Deoziger এর বক্তব্যে বরং উল্টো চিত্রই ভেসে  উঠেছে। প্রায় সব আয় শুধুই সম্পদশালী আমরিকানদের হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মধ্যম মানের কর্মীদের জন্য কোন উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছি না, দরিদ্রদের বিষয়টি তো ভিন্নই (I do not see bright prospects for the median worker, much less the poor)

সুদকে অব্যাহত রেখে আয় বণ্টনে সুসমতা আনা ও উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে পণ্যের মূল্য সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা কঠিন শুধু নয়, প্রায় অসম্ভব। এখন যা করা হচ্ছে সর্ব সাধারণকেও ঋণ সুবিধা দিয়ে তাদেরকে সূদ পরিশোধে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশেষত: ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়াসই লক্ষ্য করা যায়। সুদূর প্রসারী ফল এতে কতটুকু হচ্ছে তা অনেক গবেষণার বিষয় বটে। সুদের বিষয়টা আমাদের আলোচনায় এত গুরুত্ব পাচ্ছে কারণ সুদের বিনিময় মূল্য নেই। আমরা যখন বাজার থেকে পণ্য ক্রয় করি, তখন সমমূল্যের বিনিময় ঘটে। প্রতিটি লেনদেনেই মূলত তাই হয়। কিন্তু বাজার থেকে সুদ নিলে, ধরুন ১০% হারে কেউ ১০ টাকা নিল তাকে পরিশোধ করতে হবে ১১ টাকা। এর মানে হলো এখানে সমমূল্যের বিনিময় ঘটেনি। ১ টাকা অতিরিক্ত বিনিময় মূল্যহীন রয়ে গেল। কেউ হয়তো বলতে পারেন  ১০ টাকা যতবার রূপান্তরিত হবে ততবার সে সমমূল্য তৈরি করবে। তাই  ঋণ গ্রহীতার এধরহ হবে তাতে ঋণ দাতার পাওনা থাকবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো ঋণ গ্রহণের পর টাকার রূপান্তর নাও ঘটতে পারে। আর ঘটলেও যতবার ঘটবে ততবারই সমমূল্যের বিনিময় ঘটবে। কিন্তু সেখানে একটি কৃত্রিম সমমূল্য তৈরি হবে। কারণ ঋণ গ্রহীতা যদি ১০ টাকা ধার না নিয়ে তা রূপান্তর করতেন তবে যে সমমূল্যে তা করতেন  ঋণ গ্রহণের ফলে তিনি তা এটিতে বর্ধিত মূল্যে করবেন। তিনি যদি যোগ্য হন তবে তাই করবেন। অন্যথায় তিনি নেগেটিভ সমমূল্যে রূপান্তর করবেন যাতে তার মূলধন ঘাটতি হবে। এভাবে সুদের ফলে বিনিময় মূল্যহীন টাকা সমাজে যত বাড়বে কার্যত উৎপাদন সেখানে ব্যাহত হবে, সামাজিক অসমতা অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাবে। মন্দার ভয়াবহতা দুনিয়ার ব্যাংকিং খাতকে তছনছ করে দিয়েছিল। বড় বড় ব্যাংক বন্ধ হয়েছে। কিন্তু এর ভয়াবহতা থেকে ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি মুক্ত রয়ে গেছে। তাই রিজিল্যান্সটা কোথায় তা আলোচিত হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রাণশক্তিই তাকে এই ধকল মোকাবিলা করে অক্ষত রেখেছে। ব্যাপকতর কল্যাণ সাধন যে শরীয়াহ্র লক্ষ্য তা ইসলামী ব্যাংকিংকে এমন দার্শনিক ভিত্তি ও প্রায়োগিক নীতি কৌশল সরবরাহ করেছে যা তার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক। এ কথা নিশ্চিত যে বর্তমান ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্র্রি চলমান প্রেক্ষিতগত সীমাবদ্ধতার কারণে শরীয়াহ্র পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারছে না। কিন্তু এতদ্সত্ত্বে¡ও সুদমুক্ত ব্যাংকিং ও নৈতিক-মানবিক মূল্যবোধ চর্চার যে নিরন্তর প্রয়াস এই ইন্ডাস্ট্রি রেখেছে তারই সুফল হিসাবে তা বিকল্প ব্যবস্থা রূপে চিহ্নিত হয়েছে। পাশ্চাত্যে বাজারের নৈতিকতার যে অভাব পরিবলক্ষিত হচ্ছে, ব্যাংক ঋণের যে বুদ্বুদ তৈরি হয়েছে তা এখানে হতে পারছে না। ইসলামী ব্যাংকিং নৈতিক নীতিমালা যেমন অনুসরণ করছে, তেমনি তার প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে বিদ্যমান প্রকৃত সম্পদ।

ধারণা করা হচ্ছে, সারা বিশ্বের অর্থনীতির যখন টালমাটাল অবস্থা তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পিছনে কার্যকর রয়েছে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অবদান। কারণ এখানে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মার্কেট শেয়ার ২০%। তাই আমাদের উচিত ইসলামী ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সাপোর্ট দেয়া। আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে ইসলামী ব্যাংকিংকে জোরদার করার প্রয়াস চালাই তবে আমাদের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেমন এর ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ হবে তেমনি বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে সারা দুনিয়ায় এর ভিত্তি আরো মজবুত হবে। এখনকার সময়ের দাবি ইসলামী ব্যাংকিং।

মোঃ মহিউদ্দিন
সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

Advertisements