সরকারি ছুটি থাকায় শুক্রবার দুপুরে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। খেতে খেতে টিভির খবর দেখছিলেন গৃহকর্তা। খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে গৃহকর্ত্রী হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে টিভি বন্ধ করে দেন। অতপর গৃহকর্তার আক্কেলজ্ঞান নিয়ে দু’চার কথা শোনান। খাবার টেবিলের অপর প্রান্তে বসা ১৫ বছরের মেয়ে ও ১৭ বছরের ছেলে মায়ের হঠাৎ অগ্নিমূর্তি দেখে অবাক দৃষ্টিতে মায়ের রাগের রহস্য বোঝার চেষ্টা করলো। ততক্ষণে গৃহকর্তা শান্তশিষ্ট স্ত্রীর ক্রোধের কারণ বুঝতে পেরে পরিবেশ হাল্কা করার জন্য বলেন, টেলিভিশনে ওই সব সচিত্র খবর দেখে ছেলেমেয়ে নষ্ট হলে কেউ বাসায় টিভি রাখতো না। টিভিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত প্রেমিক সংঘে’র উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের খবর দেখে গৃহকর্ত্রীর রাগ পড়ে না। বলেন, কীসের ভ্যালেনটাইন ডে? বিজাতীয় সংস্কৃতির ওই বেলেল্লাপনা দেখে ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতোক্ষণে দুই ভাইবোন বুঝতে পারে রাগ করে মায়ের টিভি বন্ধ করে দেয়ার রহস্য।
ভ্যালেনটাইন ডে উপলক্ষে প্রেমিক-প্রেমিকার ফুল দেয়া নেয়া, যুবতীর খোপায় যুবকের ফুল বেঁধে দেয়া এবং যুবক-যুবতির ঢলাঢলির দৃশ্যসহ টিভিতে খবর প্রচার করা হচ্ছিল। ভুক্তভোগী ভদ্রলোক জানালেন, গত কয়েকদিন থেকে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যালেনগুলোতে ১৪ জানুয়ারি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে নাটক, অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর, বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। এসব নাটক এবং অনুষ্ঠানের খবরে কাটপিচ প্রচার করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নামধারী কিছু মানুষ। এসব কারণে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে টিভি দেখা এবং খবর শোনার সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। শুধু ওই মধ্যবিত্ত পরিবার নয়; তথাকথিত ভ্যালেনটাইন ডে নিয়ে মিডিয়ার বাড়াবাড়ি এদেশের কোটি কোটি ইসলাম প্রিয় দর্শককে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। প্রশ্ন হলো বিদেশ থেকে আমদানি করা ‘ভ্যালেনটাইন ডে’ কি বাংলাদেশের সংস্কৃতি? বাংলাদেশের হাজার বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে বিদেশি এ অপসংস্কৃতি যায়? এদেশের মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ এবং নৃতাস্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠি কি ১০/১২ বছর আগেও ভ্যালেনটাইন ডে’র নাম শুনেছে? হঠাৎ করে কেন এই বিজাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে এতো মাতামাতি? সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে কি মুসলিম রেঁনেসা, বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংসের নীল নকশার অংশ হিসেবে এই সংস্কৃতি নিয়ে মিডিয়ায় তোড়জোড় শুরু হয়েছে? গুণীজনেরা বলেছেন, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে আগে তার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হবে। তাহলে কি এ জাতিকে ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে বাংলাদেশের কৃষ্টি কালচারকে ধ্বংস করার চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে? সে জন্যই টার্গেট করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। তরুণ সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে মিডিয়ার মাধ্যমে। মানুষের চিন্তা চেতনায় মনস্তাত্তিক পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘ভালোবাসার ধর্মঘট’ পালন করেছে বঞ্চিত প্রেমিকেরা। তারা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও করে। তাদের সেøাগান ছিল ‘কেউ পাবে আর কেউ পাবে না, তা হবে না, তা হবে না’। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনের বটতলায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত প্রেমিক সংঘে’র উদ্যোগে এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। ‘প্রেম হোক সকলের জন্য’ এই দাবিতে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী একটি মিছিল বের করে। প্রশ্ন হলো এরা কারা? দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে শিক্ষা লাভের বদলে প্রেম নিবেদন কি সুস্থ মানসিকতার পর্যায়ে পড়ে। তরুণদের মাথা বিগড়ে দিচ্ছে কারা? তাদের এজেন্ডা কি? কয়েকদিন থেকে মিডিয়াগুলোতে ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে। পবিত্র ঈদ উপলক্ষে টিভি চ্যানেলগুলো যেমন বিনোদনের অনুষ্ঠানমালা সাজায় অনেকটা ১৪ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সেভাবে অনুুষ্ঠান সাজায় ইলেক্ট্রোনিক্স মিডিয়াগুলো। এ ক্ষেত্রে কিছু প্রিন্ট মিডিয়াও পিছিয়ে নেই। তারাও ভ্যালেনটাইন ডে উপলক্ষে লেখালেখি করছে। প্রেম-ভালবাসার নামে তরুণ-তরুণীদের উসকে দিচ্ছে। কেউ পরিকল্পিতভাবে বিজাতীয় অপসংস্কৃতি বাংলাদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে; আবার কেউ হুজুগে অপসংস্কৃতি পালনে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আবার কেউ ভালোবাসা দিবস পালনের মাধ্যমে তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে জাতে উঠার চেষ্টা করছে।
ইন্টারনেটের যুগে এক জায়গায় বসে বিশ্বের তাবৎ প্রভাবশালী প্রিন্ট মিডিয়া পড়া যায়। ইলেক্ট্রিক মিডিয়ার খবরও শোনা যায়, পড়া যায়। ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো দেখে এবং খবর পড়ে বোঝা গেল ওই সব দেশের মিডিয়াগুলোর মাথাব্যথা নেই ভ্যালেনটাইন ডে নিয়ে। দু’একটি মিডিয়ায় ছোট্ট করে খবরটি যায়গা পেলেও ছাপা হয়েছে গুরুত্বহীন ভাবে। এমনকি ভারতের মিডিয়াগুলোতেও ভ্যালেনটাইন ডে নিয়ে মাতামাতি নেই। অথচ বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে (বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি) চলছে ভ্যালেনটাইন ডে নিয়ে অনুষ্ঠান, নাটক, গান, আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রতিযোগিতা। কার আগে কে যায় সে প্রতিযোগিতায় নেমে মিডিয়াগুলোর অবস্থা যেন ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ অবস্থা। এটা কি নিছক দর্শকদের বিনোদন দেয়ার প্রতিযোগিতা নাকি অন্যকিছু? একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, একটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে বেড়ে ওঠে। নানান ভাবে চেষ্টার পরও সে জাতিকে ধ্বংস করা সম্ভব না হলে তার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হয়। সংস্কৃতি ধ্বংস করা গেলে সে জাতিকে অতি সহজেই বশে আনা যায়। সে লক্ষ্যেই সুকৌশলে বিদেশি অপসংস্কৃতি আমদানি করে এদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একজন প্রবীণ সাংবাদিক এবং জাতীয়তাবাদী ধারার বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইন ডে আমদানি করেন। ২০০১-২০০২ সালে তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকার (বর্তমানে দৈনিক) মাধ্যমে বিজাতীয় ভ্যালেন্টাইন ডে আমদানি করেন। কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি এ অপকর্ম করেছেন তা আজও পরিষ্কার নয়। অথচ তিনি এখনো নিজেকে জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে দাবি করেন। জাতীয়তাবাদী ধারার ওই বুদ্ধিজীবীর অপকর্মকে কাজে লাগিয়ে অন্যেরা এখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতির জালে জড়িয়ে ফেলছে। ইতিহাসে জানা যায়, ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে যুদ্ধের প্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হয়। সে সময় রোমের খ্রিস্টান গির্জার পুরোহিত ‘ভ্যালেন্টাইন’ রাজার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে অতি গোপনে নারী-পুরুষের বিবাহ বন্ধনের কাজ সম্পন্ন করতেন। এ ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পর তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। আইন অমান্যের কারণ জানতে চাইলে ভ্যালেন্টাইন রাজাকে জানান খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসের কারণে তিনি কাউকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বারণ করতে পারেন না। রাজা তখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় রাজা তাকে (ভ্যালেন্টাইন) খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে আসার প্রস্তাব দেন। রাজি হলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে জানান। রাজা দ্বিতীয় ক্লডিয়াস প্রাচীন রোমান পৌত্তলিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন। রোমান সা¤্রাজ্যে এ ধর্মের প্রাধান্য ছিল।
পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন রাজার প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানান। তখন রাজা তাকে মৃত্যুদ-ের নির্দেশ দেন। অতপর রাজার নির্দেশে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। পরে ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে খিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ ঘোষণা করেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ বলা হয়। কিন্তু দিবসটি নিয়ে নেই কোনো মাতামাতি। অথচ এদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক নেই; বছরেও একবার গ্রামে যান না তারা সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারি সেজে বসেছেন। বিদেশিদের এজেন্ট হিসেবে প্রগতিশীলতার নামে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। তাদের কাছে কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, লালন শাহ, হাসন রাজা, আউল বাউল ভাটিয়ালীর চেয়ে বেশি প্রিয় বিদেশি সংস্কৃতি। দেশীয় সংস্কৃতি চর্চা করে ‘খ্যাত’ হিসেবে না থেকে নিজেকে বিদেশি কালচারে জড়িয়ে প্রগতিশীলতার তালিকায় দেখতে চান। ইসলাম, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সমাাজিক দায়বদ্ধতা তাদের কাছে গুরুত্বহীন। গুরুত্ব শুধু বিদেশি অপসংস্কৃতি আমদানিতে। ভ্যালেন্টাইন ডে নামে যে অপসংস্কৃতি নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে তা প্রতিহত করতে না পারলে সামনে বিদেশি অপসংস্কৃতি আর বেলেল্লাপনার দাপটে দেশীয় সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। তখন সপরিবারে তথা ছেলেমেয়ে নিয়ে এক সঙ্গে টিভি দেখা নয়; স্বামী স্ত্রীও একসঙ্গে টিভি দেখা বন্ধ হয়ে যাবে।
উৎসঃ   ইনকিলাব
Advertisements