পাকিস্তানে গত বৃহস্পতিবার একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে বলা যায়। তালেবানদের চার সদস্যের একটা প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে সরকারের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে তিন ঘণ্টা ধরে শান্তি আলোচনা শুরু করেছে। আলোচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়নি। হবে বলে কেউ আশাও করেনি। দু’টি প্রতিনিধিদল শুধু পরস্পরের মতামত জেনে নিয়েছে। তবু আলোচনার জন্য আলোচনার যে সূত্রপাত হয়েছে, বরফের প্রাচীর যে গলতে শুরু করেছে, সেটাকে অনেকেই আশার লক্ষণ বিবেচনা করছেন।
কিছুকাল ধরেই শোনা যাচ্ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আলোচনার মাধ্যমে তালেবানদের সাথে মীমাংসায় আসতে আগ্রহী। তালেবানরাও নিশ্চয়ই অনুকূল সাড়া দিয়েছিল। এরা প্রথমে ক্রিকেট তারকা থেকে রূপান্তরিত রাজনীতিক ইমরান খানকে তাদের প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল; কিন্তু ইমরান খান শেষ পর্যন্ত রাজি হননি। এ নিয়ে কিছু সময় নষ্ট হয়েছে। মনে হচ্ছে উভয়পক্ষই এখন বুঝে গেছে  আলোচনার মাধ্যমে ছাড়া শান্তি আসবে না এবং শান্তি স্থাপিত  না হলে পাকিস্তানের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হবে।
পাকিস্তানের বর্তমান সঙ্কটের সূচনা ভারতবর্ষের বিভক্তির অব্যবহিত পর থেকেই শুরু হয়েছে বলা চলে। পাঞ্জাবি আমলা ও সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে একটা উপনিবেশ হিসেবে শাসন করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নে অযথা বছরের পর বছর বিলম্ব করা হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের সময় থেকে ২৩ বছর কোনো জাতীয় নির্বাচন হয়নি। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে উচ্চাভিলাষী সেনানায়কেরা রাজনীতিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পকিল্পনা করেন। সে লক্ষ্যে এরা হাত-কাটা, পা-কাটা, মাথা-কাটা নানা ধরনের উদ্ভট গণতন্ত্র উদ্ভাবনের প্রয়াস পান। অন্য দিকে গণতন্ত্রের  ধ্বজাধারী রাজনীতিকেরাও নিজেদের অধিকার ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। পরিণতিতে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে একটা ত্রিমুখী কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী সেন্টো (সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন) ও সিটো (সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন) সামরিক চুক্তি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যে চতুর্থ একটা মাত্রা যোগ করে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত আফগানিস্তান দখল করেছিল। আফগানেরা বহু দল-উপদল আর গোষ্ঠীতে বিভক্ত। সনাতনী কাল থেকে তাদের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ এবং যুদ্ধ লেখেই থাকে; কিন্তু সে জাতির একটা বৈশিষ্ট্য কোনো বিদেশী হানাদার এলে বিবাদ-বিসম্বাদ ভুলে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করে। রুশদের বেলাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। রুশ সৈন্যদের ওপর এরা আক্রমণ করেছে, শত শত রুশ ট্যাঙ্ক হাতবোমা আর রকেট দিয়ে ধ্বংস করেছে, রুশ হেলিকপ্টার, এমনকি রুশ জঙ্গিবিমানও গুলি করে নামিয়েছে। তালেবানেরা আগে থেকেই এই প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। সৌদি আরব আর পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অর্থ ও অস্ত্র চালান দিয়েছে। রুশবিরোধী গেরিলা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিল।
কোন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষা কিংবা স্বাধীনতা লাভের যুদ্ধে অন্য দেশের কাছ থেকে সামরিক সাহায্য লাভ নতুন কথা নয়। সব যুগে সব মহাদেশে এ জাতীয় ঘটনা ঘটে এসেছে। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। একাত্তরে আমরা যখন স্বাধীন হতে যুদ্ধ করেছিলাম প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা উল্লেøখযোগ্য পরিমাণ সমরাস্ত্র পেয়েছেন। প্রয়োজনবোধে ভারতীয় নাগরিকেরা তাদের আশ্রয়ও দিয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত বান নামে পরিচিত সাতটি রাজ্যে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলছে অর্ধশতাব্দী ধরে। সাত বোনের মুক্তিযোদ্ধারা খালি হাতে যুদ্ধ করছেন না। এরা কোথাও না কোথাও থেকে অস্ত্র পাচ্ছেন। মধ্য ও পূর্ব ভারতের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও বিভিন্ন সূত্রে অস্ত্র পাচ্ছেন। কৃতজ্ঞ বাংলাদেশীরা যদি গোপনে সাত বোনের মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু সাহায্য দিতে চায় তাহলে বিস্ময়ে গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার প্রয়োজন ঘটে না। সে পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় কাউকে ফাঁসির দণ্ড দেয়া আমার মতে উচিত নয়। বাংলাদেশের মানুষকে খুন করে, তাদের প্রাণদণ্ড দিয়ে ঢাকার সন্দেহজনক বৈধতার সরকার প্রতিবেশীর সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে মাত্র।

ওদের অস্ত্রসাহায্য কে দিয়েছিল
সোভিয়েত হানাদারদের বিতাড়নের লক্ষ্যে তালেবান ও আলকায়েদাকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের তাঁবেদার কোনো কোনো উপসাগরীয় দেশ। প্রশিক্ষণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দেয়া হয়েছে আফগানিস্তানসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আসন্ন পতনের মুখে মস্কো আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়। এবারে আলকায়েদা এবং তাদের আশ্রয়দাতা কাবুলের তালেবান সরকারকে ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা আফগানিস্তান আক্রমণ করে। এটাও স্বাভাবিক ছিল। অপরাধ জগৎবিষয়ক উপন্যাস যারা পড়েছেন তারা অবশ্যই জানবেন, আপনি যদি ভাড়া করা খুনি দিয়ে কাউকে খুন করান তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে খুনিকেও খুন করা আপনার জন্য জরুরি হয়ে পড়বে; নইলে সে এবারে আপনাকে খুন করার চেষ্টা করবে। বিন লাদেন ও তালেবানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সামরিক অভিযানের হেতুও ছিল এটাই।
বহু হাজার তালেবান ও আলকায়েদা সমর্থক আফগান শরণার্থী হয়ে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন। এদের অনেকেরই আবার সে এলাকার বিভিন্ন উপজাতির সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। সে সুবাদে তালেবান ও আল কায়েদার সমর্থন পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়ে। এ দিকে পাকিস্তানে যখন কলহ ও দলাদলিতে দুর্বল রাজনীতিকেরা ক্ষমতার মালিকানা নিয়ে সেনাবাহিনীর সাথে কোন্দলে লিপ্ত সে সুযোগে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতৃত্বে ইসলামপন্থী রাজনীতিকেরা পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হন। বলতে গেলে দেশের একটা বিরাট এলাকা ইসলামাবাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তালেবান গেরিলারা প্রায়ই পাকিস্তানি আশ্রয় থেকে গিয়ে আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদার বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে এসেছেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওয়াশিংটনের চাপে প্রায়ই সে এলাকায় সামরিক অভিযান চালায়। অন্য দিকে দূর নিয়ন্ত্রিত পাইলটবিহীন ড্রোন বিমানের আক্রমণ চালিয়ে মার্কিনিরা প্রায়ই উপজাতীয় অঞ্চলে বহু নিরীহ মানুষকেও হত্যা করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলা এবং মার্কিন ড্রোনের আক্রমণে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় ৪৯ হাজার পাকিস্তানি মারা গেছেন। পাকিস্তানের বহু প্রতিবাদের পর ড্রোন আক্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ আছে শুনেছি।

আগ্রহ পাকিস্তানেরই বেশি
তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান সরকারকেই আগ্রহ বেশি মনে হচ্ছে। মহানগরী করাচির নিয়ন্ত্রণ অনেক দিন আগেই আলতাফ হোসেনের মোহাজের দলের হাতে চলে গেছে। এরা এখন পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ারও দাবি তুলছে। সিন্ধে রাজনৈতিক অসন্তোষ টগবগ করে ফুটছে। দেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রভাব বাড়তির দিকে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে পাকিস্তান খান খান হয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে।
তালেবানদের স্বার্থের এখন মোড় ঘুরেছে। ব্রিটিশরা আফগানিস্তান ছেড়ে এসেছে। মার্কিনিরাও ছেড়ে যাবে চলতি বছরে। ১২ বছরের যুদ্ধে তাদের কোনো বাস্তব ফল লাভ হয়নি। বহু নিরীহ আফগানকে এরা খুন করেছে। উল্টো মারও তারা কম খায়নি। হাজারে হাজারে বিলিয়ন ডলার এদের গচ্চায় গেছে ইরাক ও আফগানযুদ্ধে। তালেবানেরা এখন দিন গুনছেন। মার্কিনিরা সরে গেলেই এরা বিজয়গর্বে ফিরে যাবেন আফগানিস্তানে। চাই কি কাবুলের মসনদও আবার তাদের হাতে আসতে পারে।
আলোচনায় বসতে তালেবান ও ইসলামাবাদ সরকারের সম্মতির এই হচ্ছে পটভূমি। বারো বছরের যুদ্ধে কান্ত শক্তিধর পাকিস্তানি বাহিনীও বুঝে গেছে অস্ত্রবলে এরা তালেবানদের পরাস্ত করতে পারবে না। তালেবানদের আগ্রহ ফিকে হয়ে যাওয়ার কারণ তো বললামই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে নওয়াজ শরিফের সরকার বিজ্ঞতাসহকারে ইসলামপন্থী দলগুলোকে গণতন্ত্র  ও সংবিধানের পথে আনতে অথবা তাদের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে কি না। এর মধ্যে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত আছে। এক হিসেবে বলতে গিলে বিশ্বের মানুষ এখন বিপ্লবী হয়ে গেছে। গায়ের জোরের কথা তারা আর শুনতে রাজি নয়।
সে শিক্ষা একেদুয়ে বিশ্বনেতাদের মস্তিষ্কেও ঢুকতে শুরু করেছে। কয়েক মাস আগে মনে হচ্ছিল পারমাণবিক বোমা তৈরির ইস্যুটাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করবে এবং আরেকটা আঞ্চলিক মহাযুদ্ধ ঘটে গেলে ওয়াশিংটনের মগজের আমানতধারী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে তার আধিপত্য আরো বিস্তার করে ফেলবে; কিন্তু প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনে শুভবুদ্ধির উদ্রেক হয়েছিল। আলোচনার মাধ্যমে তিনি সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন মনে হয়। ভয়ানক গোস্বা করেছে ইসরাইল; কিন্তু বিশ্বের মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।
গোটা মধ্যপ্রাচ্যের তলদেশে আরেকটা জ্বলন্ত বোমা সিরিয়া। বাশার আাল আসাদ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তিনি তার বাপের সম্পত্তির দখল ছাড়বেন না। তিন বছরের যুদ্ধে সিরিয়া দেশটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা গেছে এ যাবৎ।  দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবন যাপন করছে ৭০ লাখ মিসরীয়। বেশির ভাগই নারী ও শিশু। অনিশ্চিত পদক্ষেপে হলেও সিরিয়া সরকার এখন নিজেদের সঙ্গিন অবস্থা বিবেচনা করে এবং বিশ্বসমাজের চাপে জেনেভায় বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসছে।

এ নির্বাচন মোটেই নির্বাচন নয়
মাত্র কয়েকটা দৃষ্টান্তই দেয়া হলো। বিশ্ববাসী এখন বুঝে গেছে গায়ের জোরে গদি দখল করে থাকার দিন এখন গত হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশে যারা জনগণের ভোট ছাড়াই গদি দখল করে আছেন, আর স্কুলের দুর্বিনীত ফাজিল ছেলেদের মতো বিরোধীদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ বর্ষণ করে যাচ্ছেন, সর্বনাশের অতল গহ্বর দেখতে তাদের এখনো বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত সরকারের ওকালতির সাহায্যে তারা বিশ্বসমাজকে ভাঁওতা দিচ্ছিলেন এই বলে যে, সংবিধানের শর্ত পালনের জন্যে রীতি রক্ষার্থে হলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হওয়া দরকার। নির্ধারিত ভোটের তারিখের আগেই বিনাভোটে নিজেদের গরিষ্ঠসংখ্যক আসনে নির্বাচিত ঘোষণা করে সে চুক্তি এরা নিজেরাই খণ্ডন করে দিয়েছেন।
জানুয়ারির পাঁচ তারিখে প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো নির্বাচনই হয়নি। দেশের কোথাও মানুষ ভোট দিতে আসেনি। অবশিষ্ট ১৪৭ আসনের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সেখানেও শতাধিক ভোটকেন্দ্র আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। সাড়ে ছয় শতাধিক কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দেয়া হয়। বহু ভিডিও ছবিতে দেখেছি নির্বাচন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা মাঠের মতো খাঁখাঁ করছে। ভেতরে কর্মকর্তারা ঘুমুচ্ছেন কিংবা হাতের নখ খুঁটছেন। বহু কেন্দ্র থেকে খবর এসেছিল যে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা সারা দিন ধরে ব্যালটে ছাপ মেরে বাক্স বোঝাই করছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য কিংবা বিশ্বাসযোগ্য হবেনা ধরে নিয়ে বিশ্বসমাজ পর্যবেক্ষক পাঠাতে অস্বীকার করেছে। কার্যক্ষেত্রেও সেটাই তারা দেখেছে এবং বলেছে। শুধু শেখ হাসিনার অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক দিল্লির সরকার ছাড়া।

মাঘ মাস কি আর আসবে না?
ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপে বিশ্বসমাজ তাৎক্ষণিকভাবে সে নির্বাচন বাতিলের দাবি করেনি। বরং কূটনৈতিক ভাষাতেই এরা যথাশিগগির সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য একটা নির্বাচন করার তাগিদ দিয়েছে শেখ হাসিনাকে। হাসিনা এবং তার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা মুখ কাঁচুমাচু করে আমতা-আমতা করেছেন এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন নতুন শর্তের কথা বলেছেন। মনে হচ্ছিল যে ধানাইপানাই করে হলেও বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সদুপদেশ এরা মেনে নেবেন।
মনে হচ্ছে এরা এখন ভাবতে শুরু করেছেন এবারের মাঘ মাস যখন কেটে গেছে তখন আর শীতের ভয় নেই। ৫ জানুয়ারির পর থেকে ভয়াবহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে সরকার-এমন জনধারণা এখন প্রবল । সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গে নকশালপন্থী বিদ্রোহের সময় কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সরকার ‘গামছা-কিলিংয়ের’ পথ ধরেছিল। রোজই সকালে প্রদেশের এখানে সেখানে গলায় গামছার ফাঁস দেয়া নকশালপন্থীদের লাশ পথের ধারে কিংবা খোলা মাঠে পড়ে থাকতে দেখা যেত; কিন্তু কী লাভ হয়েছে কংগ্রেসের? ৩৭ বছর তারা পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা হাতে পায়নি। বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে সে রকম লাশের মিছিল। রাজনৈতিক পন্থায় সরকার বিরোধীদের মোকাবিলা করতে পারছে না। কারাগারগুলোতেও আর রাজবন্দীদের ধারণের স্থান নেই। এখন শুরু হয়েছে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এবং নিছক গ্রেফতার কিংবা গুম করে মাথায় গুলি করে হত্যার প্রক্রিয়া।
এ কথা এখন সবাইই জানেন ও বিশ্বাস করেন যে, দলীয়কৃত পুলিশ ও র‌্যাব সরকার এবং আওয়ামী লীগের প্রাইভেট আর্মি ছাড়া কিছুই নয়। সরকার এত দিন ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে অক্সিলিয়ারি পুলিশবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছিল। সরকার ও শাসকদলের অনুকরণে এরা এখন স্বাধীনভাবে লুণ্ঠন, টেন্ডার ও চাঁদাবাজিতে মেতেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা এবং মন্ত্রীরাও নাকি এখন শঙ্কিত। ছাত্রলীগ আর যুবলীগকে এরা আর সামালে রাখতে পারছে না। বোতলের দৈত্য আর বোতলে ঢুকতে রাজি নয়। শুনছি প্রধানমন্ত্রী তাদের পুলিশ বাহিনীতে ভর্তি করে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা ভাবছেন। সে জন্য নাকি ৫০ হাজার পুলিশ নিয়োগেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এরশাদ হাসিনার জিওল মাছ?
এই হচ্ছে আইনশৃঙ্খলাহীনতার কিছু খণ্ডচিত্র। সর্বশেষ খেলা চলছে জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা নিয়ে। প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে থাকার পর শেখ হাসিনা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে দেশে ফিরে আসেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। তার কিছুকাল আগেই জেনারেল এরশাদ ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরেন। এর মাত্র ১৩ দিন পর ৩০ মে রাতে কয়েকজন সেনাকর্মকর্তার ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়া শহীদ হন। পুলিশ চট্টগ্রাম এলাকার সেনাপ্রধান জেনালের মঞ্জুরকে গ্রেফতার করে; কিন্তু সেনাবাহিনীর কিছু লোক তাকে ছিনিয়ে পতেঙ্গা সেনানিবাসে নিয়ে আসে। সেখানে রাতের বেলাতেই মাথার পেছনে একটিমাত্র গুলি তাকে হত্যা করা হয়Ñ খুব সম্ভবত জিয়া হত্যায় আরো কোনো রাঘব বোয়াল জড়িত ছিলেন কি না চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে।
জিয়া হত্যা মামলার অন্যতম ও প্রধান আসামি সাবেক জেনারেল এইচ এম এরশাদ। এ মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার কথা ছিল গত সোমবার ১০ ফেব্রুয়ারি; কিন্তু তার ক’দিন আগে একজন বিচারককে বদলি করা হয়। এবার আবার নতুন করে মামলার শুনানি হবে। উল্লেখ্য, একই টেকনিকে অতীতেও বহুবার এ মামলার রায়দান পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।
ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে দেখতাম বিরাট মাটির জালায় পানিতে মাগুরমাছ জিইয়ে রাখা হতো প্রয়োজন মতো তুলে রান্না করার জন্য। আমার মনে হয় হত্যা মামলা ঝুলিয়ে রেখে জেনারেল এরশাদকেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য ‘জিইয়ে’ রাখা হচ্ছে। তিনি যাতে কোনোভাবেই বিরোধিতা করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক খেলা বানচাল করে দিতে না পারেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল এরশাদ ঘোষণা করেছিলেন যে, তার দল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেবে না। আর পরিণতি কী হয়েছিল কাউকে মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন আছে কি? ইসরাইলি কমান্ডো স্টাইলে এরশাদকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সামরিক হাসপাতালে অসুস্থ রাখা হয়, যদিও তাকে গলফ খেলার সুযোগ দেয়া হয়েছিল।
সে অবসরে জাতীয় পার্টিকে ভেঙে খান খান করে ফেলা হয়, রওশন এরশাদকে পার্টির নতুন নেত্রী এবং সার্কাসের সংসদে সঙের মতো গৃহপালিত বিরোধী দলের নেত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনাকে আমোদিত করা ছাড়া তার আর অন্য কোনো ভূমিকার কথা কেউ ভাবতে পারেন না। জাতীয় পার্টির কোন টুকরোর কে নেতা সেটা এখন রীতিমতো গবেষণার বিষয়। তবে আমি  ধরে নিয়েছি শেখ হাসিনা যত দিন ক্ষমতায় আছেন তত দিন মঞ্জুর হত্যার রায় দেয়া হবে না। কারণ এই যে, এরশাদ এবং হাসিনা পরস্পরের এত বেশি এমন খবর জানেন যে, সেসব ফাঁস হওয়া দু’জনের  কারো জন্যেই শুভ হবে না।

লাশের মিছিলে কার কী লাভ হবে
লাশের মিছিলের কথা বলছিলাম। চারদিকে অভিযোগ, তাদের খুন করছে সরকারপক্ষের লোকেরা; কিন্তু সরকারি গোয়েবলসরা দায় চাপাচ্ছে বিরোধীদের ওপর। হিন্দুদের নির্যাতন করছে, তাদের ঘরবাড়ি দোকান মন্দির পোড়াচ্ছে আওয়ামী লীগের গুণ্ডারাÑ এখন। হিন্দু নেতারাই বলছেন সে কথা; কিন্তু সরকার দোষারোপ করছে জামায়াত আর বিএনপির ওপর। বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে বলে গুজব শুনলেও ভারতের অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়। হাসিনা ও তার সরকার আশা করছেন তিনি  ‘ইসলামি সন্ত্রাস’ দলন করছেন শুনলে পশ্চিমা স্থূলমতিরাও খুশি হবে। এই সরকারের কোথাও এটা বোঝার মতো মাথার ঘিলু নেই যে, এসব অপকাণ্ড এবং অপপ্রচার  করে তারা একাধারে বাংলাদেশ, এ দেশের মানুষ এবং ইসলামের বিরুদ্ধেও কুৎসা ছড়াচ্ছে।
এসব করে কী লাভ হবে বলে আশা করছে এরা? পশ্চিম গোলার্ধে ক্রমেই বেশি সংখ্যায় মানুষ ধর্মান্তরিত হচ্ছে, ইসলামকে আলিঙ্গন করছে। বাংলাদেশে সবাই হেফাজতে ইসলাম হয়ে যাচ্ছে। কী লাভ হবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে? রোমের সম্রাটরা একদা জিশুখ্রিষ্টের অনুসারীদের হিংস্র সিংহের সামনে ঠেলে দিয়েছেন, বহু দিন এই নতুন ধর্মকে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। নিষিদ্ধ হলে জামায়াত ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যাবে। শতগুণ ভয়াবহতা নিয়ে তারা বংশানুক্রমিক আওয়ামীপন্থীদের শত্রুতে পরিণত হবে। সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বারাক ওবামা, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ কিংবা পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফের কাছ থেকেও শিক্ষা নিতে পারেন; কিন্তু সে সুমতি ও শুভবুদ্ধির উদ্রেক হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে রাখা যাবে না। বিশ্বসমাজও সেটাই মনে করছে। মাসাধিককাল ভারতীয় কূটনীতিকেরা আমাদের সরকারের হয়ে দেশে দেশে ওকালতি করছেন। এখন অভিনন্দন ক্রয় করেছে বাংলাদেশ সরকার; কিন্তু বিদেশীরা তাদের গড়িমসিতে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছে। অনেক দেশের রাষ্ট্রদূতেরা আবারো তাড়া দিচ্ছেন সরকারকে; সরকার যদি নিজের এবং বাংলাদেশের সর্বনাশ এড়াতে চায় তাহলে এই শেষ মুহূর্তে এসেও শুভবুদ্ধির ডাকে সাড়া দিতে পারেন। তা না হলে কী যে ঘটতে পারে ভাবতেও আমরা শিউরে উঠছি।

সিরাজুর রহমান
লন্ডন, ১১.০২.১৪
বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান
serajurrahman34@gmail.com
Advertisements