মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার ১৪ নম্বর অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেছে আসামিপক্ষ। যুক্তির্ক উপস্থাপনকালে অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দেলোয়ার শিকদার যে এক ব্যক্তি নন এবং আলাদা তা রাষ্ট্রপক্ষের ২৩তম সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, এ সাক্ষী সাক্ষ্য দেয়ার সময় মাওলানা সাঈদীকে ডকে চিহ্নিত করতে পারেননি। জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয় ‘সেকেন্দার শিকদার, দানেস মোল্লা, সৈয়দ মো. আফজাল, দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার এরা রাজাকার বাহিনী গঠন করে’। জবাবে মধুসূদন ঘরামী বলেন, ‘হ্যাঁ’। জেরায় তাকে আবার প্রশ্ন করা হয় ‘আপনার এলাকায় আরেকজন কুখ্যাত রাজাকার ছিল মোসলেম মাওলানা? জবাবে মধুসূদন বলেন ‘হ্যাঁ’। জেরায় আরেকটি প্রশ্ন ছিল ‘রাজ্জাক রাজাকার, দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার, এদের অত্যাচারের কারণে স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার লোকজন মিলে এদেরকে মেরে ফেলে।’ এর জবাবে সাক্ষী বলেন, পিরোজপুরে হতে পারে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মাওলানা সাঈদীর বাবার নাম ইউসুফ সাঈদী। আর ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় মধুসুদনকে সুস্পষ্টভাবে দেলোয়ার শিকদার, পিতা রসুল শিকদার উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালে অত্যাচারের কারণে দেলোয়ার শিকদারকে মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার লোকজন মিলে মেরে ফেলেছে। জবাবে মধুসুদন বলেছেন, দেলোয়ার শিকদারকে পিরোজপুর মেরে ফেলা হতে পারে।
প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন। এরপর মামলার কার্যক্রম আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
যুক্তি উপস্থাপনের শুরুতে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান প্রথমে ট্রাইব্যুনালের রায় থেকে ১৪ নম্বর অভিযোগ পড়ে শোনান। এতে বলা হয়েছে, মাওলানা সাঈদীর নেতৃত্বে হোগলাবুনিয়া গ্রামে হিন্দু পাড়ায় আক্রমণ এবং এ সময় শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মাওলানা সাঈদী ধর্ষণ করেননি। তখন একজন বিচারপতি প্রশ্ন করেন, সে সেখানে ছিল কিনা। আরেকজন বিচারপতি বলেন, অভিযোগ হলো আসামির নেতৃত্বে তারা সেখানে গেছে। এ সময় একজন বিচারপতি রায় থেকে একটি লাইন পড়ে শোনাতে বলেন অ্যাডভোকেট শাহজাহানকে যেখানে লেখা রয়েছে, তার টিমের সদস্যরা ঘরে আগুন দিয়েছে। অ্যাডভোকেট শাহজাহান লাইনটি পড়ে শোনান। এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে এ অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের ১, ২, ৩ এবং ২৩ নম্বর সাক্ষীর ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সাব্যস্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রাষ্ট্রপক্ষের ১, ২ এবং তিন নং সাক্ষী হোগলাবুনিয়া গ্রামে হিন্দুপাড়ায় আগুন দেয়া এবং শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করার বিষয়ে একটি কথাও বলেনি।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ২৩ নম্বর সাক্ষী মধুসূদন ঘরামী শেফালী ঘরামীর স্বামী এবং তিনি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর তিনি মধুসূদন ঘরামীর জবানবন্দি এবং জেরা থেকে পড়ে শোনান আদালতে।
মধুসূদন ঘরামী তার জবানবন্দিতে বলেছেন, তার বড়ভাই নিকুঞ্জ ১৯৭০ সালের আগেই মারা গেছে। যখন সেনাবাহিনী নামে এবং লুটপাট শুরু করে তার আগে মধুসূদন বিয়ে করেছেন। ফালগুন মাসে তিনি শেফালী ঘরামীকে বিয়ে করেছেন বলে জানান।
তাদের বাড়িতে রাজাকার বাহিনীর গমন এবং তার স্ত্রীকে ধর্ষণ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, কারা এসেছিল তা তিনি জানেন না। তিনি সে সময় বাড়িতে ছিলেন না। তার স্ত্রী পরে তাকে বলেছে তোমাকে যে মুসলমান বানিয়েছে সে এসেছিল। তার স্ত্রী তাকে আরও জানিয়েছে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অসহ্য যন্ত্রণা। আর বলতে পারছি না। আমার চিন্তা করো না। তুমি পালাও। মুধসূদন ঘরামী আরও জানান, তাদের বাড়িতে লুটপাটের চার পাঁচ মাস পরে অগ্রহায়ণ মাসে তার স্ত্রীর একটি কন্যা সন্তান হয়। তার নাম সন্ধ্যা। সন্তান হওয়ার পর তার স্ত্রীকে লোকজন গঞ্জনা করত। তখন তিনি তার শ্যালক কার্তিক শিকদারকে বললেন কি করবা? সে বলল ভারতে নিয়ে যাই। তখন তার স্ত্রী ভারতে চলে যায়। তারপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। এবং তিনি আর বিয়ে করেননি।
জবানবন্দি থেকে এ পর্যন্ত পড়ে শোনানোর পর জেরা থেকে পড়ে শোনান অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দেলোয়ার শিকদার যে এক ব্যক্তি নন এবং আলাদা তা এ সাক্ষী স্বীকার করেছেন। তাছাড়া তিনি সাক্ষ্য দেয়ার সময় মাওলানা সাঈদীকে ডকে চিহ্নিত করতে পারেননি। জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয় ‘সেকেন্দার শিকদার, দানেস মোল্লা, সৈয়দ মো. আফজাল, দেলোয়ার শিকদার, পিতা রসুল শিকদার এরা রাজাকার বাহিনী গঠন করে’। জবাবে মুধসূদন ঘরামী বলেন, ‘হ্যাঁ’। জেরায় তাকে আবার প্রশ্ন করা হয় ‘আপনার এলাকায় আরেকজন কুখ্যাত রাজাকার ছিল মোসলেম মাওলানা? জবাবে মধুসূদন বলেন ‘হ্যা’।
জেরায় আরেকটি প্রশ্ন ছিল ‘রাজ্জাক রাজাকার, দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার। এদের অত্যাচারের কারণে স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার লোকজন মিলে এদেরকে মেরে ফেলে।’ এর জবাবে সাক্ষী বলেন, পিরোজপুরে হতে পারে।
অ্যাডভোকেট শাহজাহান বলেন, মাওলানা সাঈদীর পিতার নাম ইউসুফ সাঈদী। আর ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় মধুসূদনকে সুস্পষ্টভাবে দেলোয়ার শিকদার পিতা রসুল শিকদার উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালে অত্যাচারের কারণে দেলোয়ার শিকদারকে মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার লোকজন মিলে মেরে ফেলেছে। জবাবে মধুসূদন বলেছেন, দেলোয়ার শিকদারকে পিরোজপুর মেরে ফেলা হতে পারে। এরপর অ্যাডভোকেট শাহজাহান মধূসূদনকে ট্রাইব্যুনালে জেরার নিম্নের অংশ পড়ে শোনান আদালতে।
প্রশ্ন : আপনার স্ত্রী তো কোনো মেম্বার চেয়ারম্যান, রাজাকার বা পিস কিমিটির লোকদের চিনতেন না। উত্তর : না। প্রশ্ন : দেলোয়ার পরে নিজেকে শিকদার পরিচয় দিত। আগে শুনিনি এখন শুনছি সাঈদী— একথাগুলো আপনি ট্রাইব্যুনালে বলেছেন কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি। উত্তর : নাও বলতে পারি। আইনজীবী : স্ত্রী বলে, তোমাকে যে মুসলমান বানায় সে এসেছিল, তুমি পালাও। একথাও আপনি বলেননি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। সাক্ষী : স্মরণ নেই। আইনজীবী : বাজারে মসজিদে বসে মুসলমান বানায় সেকথাও বলেননি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। সাক্ষী : মনে নেই। আইনজীবী : আপনার নাম আলী আশরাফ আর কৃষ্ণ বাবুর নাম আলী আকবার রাখা হয় সেকথাও বলেননি। সাক্ষী : স্মরণ নেই। আইনজীবী : কাশেম আলী হাওলাদার ওরফে কাশেম মাস্টার আপনার একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলে যায় এবং সাত মাস জেল খাটে। সাক্ষী : হ্যাঁ। আইনজীবী : কাশেম মাস্টার আপনার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে সে অভিযোগ আপনি করেন এবং এ কারণে সে জেলে যায়। সাক্ষী : সত্য নয়। আইনজীবী : আপনার স্ত্রী শেফালী ঘরামী ভারতে চলে গেছে আপনার সাথে বিরোধের কারণে। সাক্ষী : সত্য নয়। আইনজীবী : ২০১০ সালের পর থেকে আপনি এবং আপনার বৌদি বয়স্ক ভাতা পান। সাক্ষী : হ্যাঁ। আইনজীবী : আপনারা দুজন একান্নে/এক পাকে খান। সাক্ষী : হ্যাঁ। আইনজীবী : সাক্ষী দেয়ার জন্য কতদিন আগে ঢাকায় আসলেন? সাক্ষী : ১৮/২০ দিন আগে অনুমান। আইনজীবী : আপনি সুস্থ অবস্থায় ঢাকায় আসেন। এই মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চাপে পড়ে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সাক্ষী : প্রায় সুস্থ অবস্থায় ঢাকায় আসি। পরে অসুস্থ হই। এ পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপনের পর অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান জ্বরে ভোগার কারণে আজকের মতো শুনানি মুলতবি করা হয়। অন্যান্য দিনের মতো অ্যাডভোকেট শাহজাহানকে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন। রাষ্ট্রপক্ষে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান।

সূত্র: আমারদেশ

Advertisements