আমাদের দেশে অনেক লোক অনেক তাড়াতাড়ি ধনী হচ্ছে। তাদের ধনী হওয়ার বয়ান নিলে মনে হবে, তারা হয় কোনো বড় লটারিতে জিতেছে, নতুবা গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে। আমরা ছোটকাল থেকে শিখে আসছি শিক্ষা, সততা, পরিশ্রম- এসব মানুষকে সমাজে অবস্থাপন্ন হতে সহায়তা করে। পরের ক্লাসগুলোতে পড়েছি, ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করলে সে ক্ষেত্রে ধনী হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। তবে চাকরিজীবীরা তেমন ধনী হতেন না। ওপরের স্তরে চাকরি করলে বেতন-ভাতার একটা অংশ সঞ্চয় করে চাকরির শেষ দিকে এসে অনেকটা আর্থিক সচ্ছলতা লাভ করা যেত। ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে কোনো সচিব, অধ্যাপক, জজ সাহেব ধনী হয়েছেন- এমন কথা কদাচিৎ শুনেছি। একটা আদর্শ ভাব ছিল প্রায় সর্বত্র। স্কুলের হেডমাস্টারের কাছে আদর্শ দেখতাম, অঙ্ক ও ইংরেজি শিক্ষকের কাছে আদর্শ দেখতাম। পরবর্তী সময়ে কলেজের প্রিন্সিপাল ও শিক্ষকদের মধ্যেও একটা আদর্শ দেখতাম। তাঁদের আদর্শ মানে প্রশাসনে এবং পাঠদানে তাঁদের আন্তরিকতা। এখন যখন শুনি তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়েনি বলে মাস্টার সাহেব ছাত্রকে কম নম্বর দিয়েছেন, তখন মাথা হেঁট হয়ে যায়। শুনেছি, এখন প্রাইভেট পড়াটা এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। যাঁরা চাপে ফেলে ছাত্রদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন, তাঁদের কাছ থেকে ছাত্র কোনো আদর্শ শিখতে পারে না। ছাত্র সেই শিক্ষককে মনে করবে একজন লোভী শিক্ষক। আমাদের সময়ে স্কুল-কলেজে কোনো রাজনৈতিক নেতার আগমন ঘটত না। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো আগ্রহ কোনো দিনই দেখা যেত না। স্কুল-কলেজে মেহমান হিসেবে কেউ যদি আসতেনই, তিনি হতেন জেলা শিক্ষা অফিসার অথবা জেলা প্রশাসক। তাঁরা স্কুল-কলেজের ছাত্রদের লেখাপড়া নিয়ে এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের পাঠদানের মান নিয়ে মাথা ঘামাতেন। সেই সময়ে প্রকৃত ভালো ছাত্ররা মূল্য পেত। বড় রকমের স্কলারশিপ ছিল তাদের জন্য, যে স্কলারশিপের অর্থে ভালো ছাত্রের পুরো মাসের হোস্টেলে থেকে পড়ালেখার সব ব্যয় নির্বাহ করা যেত।

ছাত্রদের মধ্যে দল ছিল বটে, তবে দলাদলিটা কম ছিল বিধায় দলের অধীনে কোনো ছাত্রকে আশ্রয় গ্রহণ করতে হতো না। আমি শিক্ষকতা জীবনে প্রবেশ করার পরও দেখেছি, রাজনীতি দেশের প্রশাসনকে গ্রাস করেনি। প্রশাসকরা ছিলেন রাজনীতি-নিরপেক্ষ এবং প্রজাতন্ত্রের অর্থকড়ি যথাযথ ব্যয় হচ্ছে কি না সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখতেন। এখন অবশ্য প্রশাসকদের ক্ষমতা কমে গেছে। এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবাই প্রশাসক। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে এবং প্রশাসনে যে জবাবদিহি আমরা সেই ষাটের দশক থেকে দেখে আসছিলাম, তা আজকে নেই। এখন যখন শুনি সরকারি কর্মকমিশনেও দুর্নীতি হয় এবং উপযুক্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে শুধু তদবির ও ক্ষেত্রবিশেষে অর্থের জোরে অন্য কেউ চাকরিটা পাচ্ছে, তখন ব্যথিত হই। আরেকটা বড় অবিচার প্রশাসনে প্রবেশ করানো হয়েছে, সেটা হলো কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় অন্বেষণ করা। ফল হয়েছে এই, অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের কর্মকর্তারা দলীয় পরিচয় মুখে উচ্চারণ করেন এবং কর্মের মাধ্যমে পরিচয় দিয়ে দলে প্রবেশ করে প্রমোশন ও ভালো পোস্টিং বাগিয়ে নেন। তাঁদের যে দৃঢ় চারিত্রিক কাঠামো ছিল, সেখানে চিড় ধরেছে। অন্যদিকে কোন কোন রাজনীতিবিদ দুর্নীতিবাজ ছিলেন, এটা আমাদের জানা ছিল না। অনেক রাজনীতিবিদ এমনই ছিলেন যে পাবলিক মানি কখনো স্পর্শ করে দেখেননি। স্কুল-কলেজের সভাপতি হওয়ার জন্য তাঁদের কোনো ইচ্ছা কোনো দিনই ছিল না। আর আজকে! আজকে জনগণকে জিজ্ঞেস করলে তারা একবাক্যেই বলবে, তাদের কথিত প্রতিনিধিরাই তাদের অর্থ বেহাত করছে।

রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা শুধু নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য তাঁরা যেন এক দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। কেন স্কুলের ছাত্রদের মন্ত্রী-এমপি সাহেবদের জন্য সংবর্ধনা সভায় যেতে হবে? তাঁরা ছাত্রদের সামনে যে বয়ান দেবেন তা থেকে কি ছাত্ররা উন্নতমানের কোনো আদর্শ শিখতে পারবে? আজকে ব্যথিত হই এই দেখে যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পরিপত্র জারি করতে হয়, মন্ত্রী-এমপিদের সভাগুলোতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যেন না নেওয়া হয়। আসলে যে মন্ত্রী সাহেব ওই সব ছাত্রছাত্রী থেকে সংবর্ধনা পাওয়ার জন্য কাতর, দোষ তো তাঁরই। মন্ত্রী-এমপি সাহেবেরই তো বলে দেওয়া উচিত ছিল, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কোনো রাজনৈতিক মিটিংয়ে আনবেন না। আসলে আমাদের অনেকের মানবিক মূল্যবোধ অনেক নিচে চলে গেছে। সে জন্য আজকে আদর্শ স্থাপন করার মতো নেতার অভাব। এখন লোকে নেতার সভায় যায় বটে, আবার সভা থেকে ফিরে এসে গালিও দেয়। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, এখন সমাজে একটা ধারণা হয়ে গেছে যে পদ-পদবি ইত্যাদি পাওয়া ও দখল করার পেছনে একটাই স্বার্থ কাজ করছে, সেটা হলো শুধু নিজেদের জন্য কিছু পাওয়া। ব্যবসায়ীদের মধ্যেও অনেকে এখন রাজনীতিবিদ হচ্ছেন। রাজনীতিবিদ হওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু তাঁরা যে কারণে রাজনীতিবিদ হচ্ছেন, সেটা হলো ওই টাইটেলটা ধারণ করতে পারলে ব্যবসায় সুবিধা হয়। রাজনৈতিকভাবে কানেকটেড থাকার কারণে অনেকে বড় বড় ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছেন। সে জন্য তাঁদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি রাজনীতিবিদ হয়ে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, শুধুই রাজনীতিবিদ ছিলেন এমন অনেকেই রাজনীতি করতে করতে ব্যবসায়ী হয়ে গেছেন। ফলে এখন ঘুষ-দুর্নীতি-ঠকানো- এসব সর্বত্র প্রবেশ করেছে। ধরেই নেওয়া হয়েছে, অসৎ পথ ছাড়া ধনী হওয়ার অন্য কোনো ভালো পথ নেই। যারা অবশ্য দুর্নীতিতে অভ্যস্ত-আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের কাছে দুর্নীতিটা অতি সহজ ব্যাপার।

আজকে সততা একটা অতি দুষ্প্রাপ্য গুণ। অনেক লোক এটা বিশ্বাসই করতে চায় না যে সমাজে এখনো কিছু সৎ লোক আছে। অধঃপতনটা কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে, সেটা বোঝা যাবে বর্তমান অবস্থায় যখন দেখি দুর্নীতিকে মহান বা গ্লোরিফাই করা হচ্ছে। যে সমাজে দুর্নীতি গ্লোরিফায়েড হয়, সেই সমাজের বড় অর্জন তো হবে দুর্নীতিই।

আবু আহমেদ
লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(কালের কন্ঠ, ১০/০২/২০১৪)

Advertisements