এখন ইন্টারনেটের সামাজিক সাইটগুলো খুললেই একটি প্রশ্নের আলোচনা-মন্তব্যের প্রাচুর্য লক্ষণীয়। প্রশ্নটি হলো, ‘আমরা কি পুলিশি রাষ্ট্রে বাস করছি?’ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ  প্রায় সব দেশের নাগরিক। অর্থাৎ সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুলিশি রাষ্ট্রের অবস্থা অনুভব করছে। কেননা ধীরে ধীরে প্রত্যেক মানুষই এ ব্যবস্থায় তাদের স্বাধীনতা হারাচ্ছে।
প্রশ্ন হতে পারে, পুলিশি রাষ্ট্র কী? এটা কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা অন্য কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থা নিয়ে এই রাষ্ট্র? অভিধানের সংজ্ঞা অনুসারে, যে রাষ্ট্র সরকার গোপন বা প্রকাশ্যে পুলিশ বাহিনী দিয়ে বিধিবহির্ভূত ক্ষমতা ইচ্ছামাফিক ব্যবহার করে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে; সে রাষ্ট্রই পুলিশি রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্রে সাধারণ জনগণের কোনো অধিকার থাকে না। তবে এমন রাষ্ট্রে আধুনিক সব ব্যবস্থাই থাকে। শুধু অধিকার সাধারণ নাগরিকদের থাকে না বা অধিকার জন্মগতভাবে ব্যবহার করতে পারে না; যদিও তা কাগজ-কলমে বলবৎ। যেমন বাসস্থান-জীবনধারণ-স্বাস্থ্যসহ সব অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে বলে প্রচার করা হলেও এগুলো প্রায়ই সাধারণ নাগরিকের আয়ত্তের বাইরে থাকে। শুধু ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা-অনুমতিসাপেক্ষেই জনগণ এসব অধিকার ভোগ করতে পারে।
তাই আভিধানিক সংজ্ঞা অনুসারে বর্তমান বিশ্বের কোনো দেশই দাবি করতে পারে না যে, সেটা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কারণ ক্ষমতাবানেরা তাদের ক্ষমতারোহণ ও ক্ষমতাচর্চার ধারায় পুলিশি রাষ্ট্রের কোনো-না-কোনো কার্যক্রমের ব্যবহার করছেন। হয়তো বা এ জন্যই নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ভোগে অভ্যস্ত মার্কিনিরাও এখন এ বিষয়টি নিয়ে এত সোচ্চার। সেই সাথে তৃতীয় বিশ্বে এর ব্যবহার কেমন ভয়াবহ হচ্ছে, তার উল্লেখও করছেন প্রায় সব বিশেষজ্ঞ। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে (১৮৫১) সর্বপ্রথম এই ধারণাটি আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা লক্ষ করেন, সাম্রাজ্যবাদ ও রাজতন্ত্রের ক্রমপতনের পর যে শাসনব্যবস্থার উদ্ভব হতে থাকে, সেখানে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। কারণ ক্ষমতালিপ্সু ও ক্ষমতাবানেরা রাজতন্ত্রের আদলেই নিজেদের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে। গণতন্ত্র তাদের ইচ্ছার বাহন হয় মাত্র। আসলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক অভিনব তথ্য। এখন বিশ্বে অন্তত দুই ডজন ধরনের গণতন্ত্র চালু আছে। আরেকটি তথ্য হলো, এসব গণতন্ত্রের মূল বাহন রাষ্ট্রশক্তি তথা পুলিশ। আবার দেখা গেছে, সময়ের ব্যবধানে একই দেশে নানা ধরনের গণতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটেছে।
রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যের পতন হয় জনগণের সক্রিয়  অংশগ্রহণে আন্দোলনের ফলে। তাই এই ক্ষমতাবানেরা রাষ্ট্রশক্তির অনৈতিক ব্যবহারের মাঝ দিয়ে জনগণের সব আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ অথবা ব্যর্থ করতে সচেষ্ট থাকে। ইতিহাসে দেখা যায়, হিটলার ও পিনোশে থেকে শুরু করে বিশ্বের সব ‘নির্বাচিত’ স্বৈরশাসকদের ক্ষমতা দখল ও চর্চার ছক একই রকম। তা হলো, তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে জনগণের সব বৈধ অধিকার ছিনতাই করে নিজের স্বাধীনতা ও নীতিবহির্ভূত ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা করে। গণতন্ত্রকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। সেজন্য তারা তাদের রাজত্বে কোনো অনাচার হয় না বলে প্রচণ্ড প্রচার চালায়।
গার্ডিয়ান পত্রিকার নাওমি উলফ ও আরো অনেকে পুলিশি রাষ্ট্র নিয়ে অনেক গভীর গবেষণা করে এর আকার, কর্মকাণ্ড ও চিহ্ন সম্পর্কে মোটামুটি একই ধারণায় এসেছেন, একটি বক্তব্যে তারা একমত হয়েছেন। স্বৈরশাসকেরা যে প্রথমেই পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করে, তা কোনো ক্রমেই স্বীকার করে না। তারা সত্যকথনকে সবচেয়ে ঘৃণা করে এবং সহ্য করতে পারে না। গবেষকেরা পুলিশি রাষ্ট্রের স্বরূপকে দু’ভাগে ভাগ করেছেনÑ এমন রাষ্ট্রের (১) চিহ্ন (২) এবং কর্মকাণ্ড।
পুলিশি রাষ্ট্রের চিহ্নের প্রথমটি হলো ‘আড়িপাতা’। কেননা এমন রাষ্ট্রের নিকট প্রত্যেক নাগরিক প্রতিবাদী ও সন্দেহজনক। আড়িপাতার ব্যাপকতার ওপর নির্ভর করবে স্বৈরশাসক তার পুলিশি রাষ্ট্র দিয়ে কতখানি জনগণকে নিয়ন্ত্রিত করতে চায় এবং এর সাথে এটাও প্রমাণিত হয়, সে নিজেকে ততখানি অসহায় ও নিরাপত্তাহীন ভাবে।
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বে এই আড়িপাতা উদঘাটনের জন্য শত শত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেখা গেছে, আড়িপাতা কর্মকাণ্ডটি প্রধানত সরকার করলেও বেসরকারিভাবেও সংঘটিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান (যেমনÑ ‘গ্রানাইট আইল্যান্ড গ্রুপ’ বলে একটি প্রতিষ্ঠান দু’পক্ষকেইÑ সরকার এবং বেসরকার) আড়ি পাততে এবং আড়ি পাতা উদঘাটন করতে সহায়তা করে। গ্রানাইট মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে এ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এটা এখন কোটি কোটি ডলারের ব্যবসায়। তারা পুলিশি রাষ্ট্র নির্ণয় করার জন্য অন্তত ২৭টি চিহ্ন শনাক্ত করেছেন। আড়ি পাতার চিহ্নের কয়েকটি এখানে দেয়া হলো। এর যেকোনো একটি হলে বুঝতে হবে, দেশটি এখন পুলিশি রাষ্ট্র।
(১) আপনার গোপন ব্যবসায়িক বা পেশাগত তথ্য অন্যেরা (সরকারি সংস্থা ও প্রতিপক্ষ) আপনার অজান্তেই জানতে পারছে। (২) কোনো গোপন সভা বা দর হাঁকার বিষয়টি তেমন গোপন থাকছে না। (৩) আপনার টেলিফোনটি প্রায়ই গোলমাল করছে। নানা শব্দ শোনা যাচ্ছে। কথা বলার সময় শব্দের ওঠানামা হচ্ছে। (৪) ফোনটি রেখে দেয়ার পরও একটা শব্দ শোনা যায়। (৫) আপনার টেলিফোনটি বাজল, কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না। (৬) আপনার গাড়ি বা বাসার রেডিওতে (এএম/এফএম) অদ্ভুত বাধার (ইন্টারফেয়ারেন্স) সৃষ্টি হচ্ছে। (৭) একই অবস্থা টেলিভিশনের জন্য (ভালো দেখা যাচ্ছে না বা মাঝে মধ্যে ছবি ঝিরঝির করছে বা অস্পষ্ট হচ্ছে)। (৮) আপনার বাড়িতে চুরি হলো, কিন্তু কিছুই খোয়া যায়নি। (৯) বিদ্যুতের লাইনের খানিকটা পরিবর্তন। (১০) দেয়ালের কোনো কোনো স্থানের রঙ চটে গেছে। (১১) দেয়ালের সংযোগস্থলে একটু বেমানান দেখা যাচ্ছে। (১২) অফিস বা বাড়ির সাইনবোর্ডে একটু পরিবর্তন। (১৩) ফোন কিং বা সরকারি ইউটিলিটি সার্ভিসের গাড়িগুলো বা এমন ধরনের অপরিচিত গাড়িগুলো মেরামতের নামে বাড়ি বা অফিসের সামনে অযথা সময়ক্ষেপণ করছে। আবার গাড়িগুলোতে লোকজনও নেই। (১৪) গৃহের আসবাবগুলো নড়ানো বা অগোছালো (যদি বাড়ির লোকেরা কোথাও যায়, সেই ফাঁকে)। (১৫) ওয়্যারড্রবে বা নিজের কাপড়ে ছোট ছোট ময়লা (নুড়ির মতো) লেগে থাকা (যেমনÑ কোথাও থেকে ফেরার পথে হঠাৎ গায়ে কেউ কিছু ফেলে দিলো)। তবে এখন আড়ি পাতার সবচেয়ে সহজ বাহন মোবাইল টেলিফোন। সম্প্রতি একটি নতুন প্রযুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষাধীন। এর মাধ্যমে গোয়েন্দারা মোবাইলের সব কথাবার্তা শুনবে, তার সাথে ছবিও ওঠাবে। এ ছবিগুলো থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। অর্থাৎ আড়ি পাতা হবে এমনভাবে যে, লক্ষ্যবস্তু এতটুকুও বুঝতে পারবে না তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। আর এভাবে সব তথ্য ও গোপনীয়তা কেড়ে নেয়া হচ্ছে।
আড়ি পাতার দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে কর্মকাণ্ড। নাওমি বলেছেন, এ ১০টি কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করবে পুলিশি রাষ্ট্র। তবে এগুলো স্বৈরশাসক ব্যবহৃত বহু পুরনো নীলনকশার অংশ।
এগুলো হলো Ñ (১) ভয়ঙ্কর অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর আবিষ্কার (যেমনÑ অস্তিত্বহীন জঙ্গি) এবং তাকে উপলক্ষ করে কঠিন নিবর্তনমূলক আইন তৈরি করা, যা আদালতের এখতিয়ারকে খাটো করে ফেলবে। সরকারের ক্ষমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা অপসারণ করা হবে। যেমন, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর প্যাট্রিয়ট আইন বা এমন অন্যান্য আইন ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে করা হয়। হিটলার রাইসট্যাগ জ্বালিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন। এখন জঙ্গিবাদ, ইসলামি সন্ত্রাসীর নামে জনগণের মানবাধিকার, মৌলিক প্রতিকারসহ সব অধিকারকে সীমিত করা হচ্ছে। কখনো কখনো সরকারিভাবেই এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে প্রতিবাদকে দোষ দেয়া। (২) হাজার হাজার মানুষকে অন্তরীণ করা হবে; বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ ছাড়াই বা মিথ্যা অভিযোগে। অতীতে রাশিয়াতে যেমন গুলাগের সৃষ্টি হয়। এখন ইরাক, আফগানিস্তান, ভারত, চীনসহ সব দেশেই হাজার হাজার মানুষ অভিযোগ ছাড়াই অন্তরীণ। হিটলার প্রবর্তিত রিমান্ডব্যবস্থার চরম অপব্যবহার করবে। উল্লেখ্য, জর্মানীতে রিমান্ড ব্যবস্থা সীমিত করায়, সেখানে অপরাধের সংখ্যা কমে যায়। (৩) সমাজের এক অংশকে অপাঙ্ক্তেয় ঘোষণা করে তাদের নানাভাবে নিপীড়ন করে দেশের মাঝে এক ভয়াবহ ভীতির সৃষ্টি করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান, প্রপাগান্ডা ও ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করা হবে। এ অনৈতিক ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করে প্রতিবাদ বা আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেয়া হবে। যেমনÑ পাসাডেনার এক যাজক ‘যিশু খ্রিষ্ট শান্তির পক্ষে ছিলেন’ বলায় তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনে আইআরএস (IRS)। অথচ যে চার্চ রিপাবলিকানদের ভোট দেয়, তারা একই কথা বললেও ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। (৪) সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্বৃত্তের দল (Thug Caste) তৈরি করা। যেমন, ইতালির ব্লাক শার্ট ও জার্মানির ব্রাউন শার্ট। তারা (এরা সরকারি দলের) প্রতিবাদীদের গুম-খুন-অত্যাচার করত এবং পুলিশ তাদের সহায়তা দিত। (৫) ইচ্ছামাফিক ধরপাকড় ও জেল দেয়া সাধারণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত করা। কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদের সম্ভাবনা দেখলে বা তেমনটি হলে পাইকারি ধরপাকড় করে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা। এ কর্মকাণ্ডে সাধারণত সমাজের গণ্যমান্য এবং সৎ ও স্পষ্ট বক্তাদের প্রধান লক্ষ করা হয়। যেমনÑ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ওয়াল্টার এফ মার্ফিকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করে আটক করা হয়েছিল। (৬) সমাজের সচেতন অংশ, যেমনÑ সরকারি কর্মচারী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক-সাংবাদিকদের বিরামহীনভাবে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো বা জীবনধারণের সমস্যায় রাখা। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনকে সব সময় উত্তপ্ত করে রাখা। এটা গোয়েবলস-এর ব্যবস্থাপত্র। সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকসমাজকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। (৭) সংবাদমাধ্যমকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। ইতালি (১৯২০), জার্মানি (১৯৩০), পূর্ব জার্মানি (১৯৫০) ইত্যাদি যেমন অতীতে করেছে, তেমনি আজকের দিনেও সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেয়ার নজির এই ব্যবস্থাপত্রের অঙ্গ। (৮) প্রতিবাদকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলে ঘোষণা ও সেভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। (৯) অভ্যন্তরীণ অতন্দ্র নজরদারি পদ্ধতি চালু করা। এখানে জাতীয় নিরাপত্তার নামে জেলজুলুমসহ অধিকার খর্বের কর্মকাণ্ড চালু হয়। (১০) সর্বোপরি, আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দেয়ার অধিকার শুধু সরকারের থাকবে এবং বিভিন্ন আইন তৈরি করে এই ব্যবস্থা চালু রাখা হবে। নাওমি উলফ বলেছেন, এ দশটি কর্মকাণ্ডের একটিও যদি চালু থাকে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রটি স্বৈরশাসক পরিচালিত একটি পুলিশি রাষ্ট্র। এসব রাষ্ট্রে আদালত থাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।
আগেই বলা হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্বৈরশাসকেরা জনগণের মনকেও পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘ভীত মানুষ কখনো সঠিক চিন্তা করতে পারে না।’ তাই স্বৈরশাসকেরা ভীতির রাজ্য কায়েম করে।
যুক্তরাষ্ট্রের আড়িপাতার নতুন অস্ত্র হলো স্ক্যানার। এটা ১৬৪ ফিট দূর থেকে একজনকে পুরোপুরি জানতে পারে। সে সরকারের ডিএনএ কর্মকাণ্ডের অধীনে প্রতি শিশুকে জন্মের পরই DNA পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা নির্ণয়ের চেষ্টা করছে, শিশুটি ভালো হবে না খারাপ হবে। এর প্রতিবাদ হচ্ছে। তবে এটা পুলিশি রাষ্ট্রের একটি চিহ্ন। এদিকে হুয়ে বার্ক এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, পুলিশি রাষ্ট্রের চৌদ্দটি চিহ্নÑ (১) পুলিশ কারণ না দেখিয়েই প্রতিবাদীদের (শান্তিপূর্ণ হলেও) ওপর গুলিবর্ষণ করছে (একটি দেশে কয়েক মাসে ৪০০ জন হত্যা করেছে), (২) বেআইনি হয়রানি সাধারণ ব্যাপার, (৩) শিশুদেরও অপরাধী বানানো, (৪) যেকোনো জায়গায় জনগণকে থামিয়ে শরীর তল্লাশি করা, (৫) জাতিগত পরিলেখ করা, (৬) নিরীহ মানুষদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থ আদায় বা আটক করা, (৭) বাড়ি ভাড়া না দেয়ার জন্যও জেল দেয়া, সরকারদলীয়দের অন্যায় উপেক্ষা করা, (৮) আড়ি পাতা, (৯) অযথা বা সাধারণ অপরাধেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া। (১০) পুলিশ বা এমন অন্যান্য দলের সদস্যরা অন্যায়, যেমনÑ হত্যা করলেও কোনো বিচার না করা, (১১) শান্তিপূর্ণ মিছিল ও প্রতিবাদকে পুলিশ দ্বারা নির্মমভাবে প্রতিহত করা, (১২) জেলখানা বিপক্ষ দলের লোক দিয়ে ভরে ফেলা, (১৩) জাতীয় নেতা বা সামাজিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তিদের লাঞ্ছিত করা, (১৪) অপরাধ প্রমাণ না করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি করা। বার্ক বলেছেন, এমনটি চলতে থাকলে মানবজাতিই বিপদগ্রস্ত হবে। পুলিশি রাষ্ট্র একপর্যায়ে নিজেদেরকেই ধ্বংস করে।
Advertisements