ছেলেবেলা প্রথমে বেতারের সাথে এবং কিছু পরে সাংবাদিকতার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। এসব সুবাদে বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিককে কাছে থেকে জানার সুযোগ হয়েছিল। কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি লিখেছিলেন, ‘কবিকে যদি হতে হয় কবিরাজ/মহাজন বাক্যবলে বাঁশী হয় বাঁশ/ তখন সম্ভব নয় কবিতার কাজ।’
বাংলাদেশের বহু সাহিত্যিক-সাংবাদিকের মনের অবস্থা বর্তমান সময়ে এরকম হতে বাধ্য। সাংবাদিকতার ওপর ব্রিটিশ আমল থেকে চাপ দেখেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেন্সরশিপ দেখেছি। পাকিস্তানে আইয়ুবি সামরিক স্বৈরতন্ত্রে শাস্তির ভয়ে সাংবাদিকেরা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ অনুসরণের পথ ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখনই উপলব্ধি করেছিলাম সেলফ-সেন্সরশিপ প্রকৃত সেন্সরশিপের চেয়ে বহুগুণে পীড়াদায়ক। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের এবং সাংবাদিকতার যেমন সঙ্কট চলছে তেমনটা আগে আর দেখিনি।
কাতারভিত্তিক জনপ্রিয় বিশ্ব টেলিভিশন আলজাজিরা মাত্র সপ্তাহখানেক আগে বলেছে, বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা ভীত, সন্ত্রস্ত; সাংবাদিকতা এ দেশে বিপজ্জনক পেশা। একই রকম বর্ণনা দিয়েছে সাংবাদিক স্বাধীনতার বিশ্বপৃষ্ঠপোষক রিপোটার্স সঁস ফ্রঁটিয়ার। দেশ-বিদেশের কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থাও বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে। তাতে লাভ হয়েছে কিছু? হয়নি। কার কথা কে শোনে?
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকেই ভীতি প্রদর্শন শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের ধাওয়া করা, তাদের গাড়িতে ইট-পাটকেল ছোড়া, ধরতে পারলে মারধর ও পেটানো শাসক দলের অঙ্গ সংস্থাগুলোর লোকদের আমোদ-প্রমোদের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের পরিবেশিত কোনো খবর সংশ্লিষ্ট কারো মনঃপূত না হলে তো কথাই ছিল না। তারপর এলো সাংবাদিক দম্পতি মেহেরুন রুনি ও তার স্বামীর মর্মান্তিক পরিণতি। এ দু’জন অনুসন্ধানী সাংবাদিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি এবং সম্ভবত গোপনে ভিন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস চালান দেয়া সম্বন্ধে তদন্ত করছিলেন বলে জানা আছে। গভীর রাতে নিজেদের শোবার ঘরে শিশুপুত্রের সামনে অমানুষিক নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হয়। তাদের ল্যাপটপ কম্পিউটারের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ কম্পিউটারেই তাদের তদন্তের তথ্যাদি ছিল।
সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন জোরগলায় ঘোষণা করেছিলেন দু’দিনের মধ্যেই ঘাতকদের গ্রেফতার করে আদর্শ শাস্তি দেয়া হবে। একই প্রতিশ্রুতি আরো কয়েকবার শোনা গেছে তার এবং তার উত্তরসূরির মুখে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই দেখা যায়নি। যাওয়ার কথাও নয়। অনেকেই মনে করেন, যারা খুন করেছে বা করিয়েছে তারা সরকারের নিজের লোক। তা ছাড়া এখন যারা গদিতে আছেন তাদের কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়েছে বলে শুনেছেন কখনো?
বিস্তারিত লিখতে হলে পুরো দিন লেগে যাবে। সার কথা হচ্ছেÑ খুব সম্ভবত ২৩ জন সাংবাদিক হত্যার খবর পড়েছি বিগত পাঁচ বছরে। শত শত সাংবাদিক দলীয়কৃত র‌্যাব-পুলিশের এবং শাসক দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হয়েছেন, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। সত্য কথা বলতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন এবং নিয়মিত নির্যাতিত হচ্ছেন মাহমুদুর রহমান। সত্য কথা বর্তমান শাসকদের সহ্য হয় না। সত্য প্রচার করতে গিয়ে মাহমুদুর রহমানের পত্রিকা আমার দেশ, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত ও ইসলামী টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং সর্বশেষ ইনকিলাব পত্রিকাটি বন্ধ করে আবার খুলে দেয়া হয়েছে। কলম ধরতে কিংবা কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত রাখতে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা এখন ভয় পান। সবাই যেন ঘাড়ের ওপর দিয়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন কখন কোন মন্দভাগ্য পেছন থেকে আসছে।

সাংবাদিকতার সেকাল ও একাল
বিবেক বিক্রি করে দিতে যারা রাজি হয়েছেন, যারা সরকারের মিথ্যা প্রোপাগান্ডাকে খবর বলে প্রচার করতে রাজি হয়েছেন এবং অজস্র সহস্র অন্যায়কে করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করতে রাজি আছেন তারা ভালো তো আছেনই, রীতিমতো ফুলেফেঁপে উঠেছেন। কিন্তু এরা দেশের বাস্তব পরিস্থিতি এবং দেশের মানুষের সাথে সম্পর্কবিবর্জিত। উদ্ভিদ বড় হয়, ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হয় মাটি থেকে রস পায় বলেই। কাগজের ফুল মাটির রস পায় না, ফল দেয় না, নিছকই ঠুনকো সে। তার কখনো নবায়ন হবে না, ধ্বংস তার অনিবার্য। যারা বিবেককে পতিতাবৃত্তির মতো ব্যবহৃত হতে দেয়, তাদের নিয়ে নষ্ট করার সময় আমার নেই।
সরকারিভাবে ৮০ বছরের জন্মদিন পালন করেছি গত সপ্তাহান্তে। সঠিক এ তারিখ মতোই যে আমার জন্ম হয়েছে হলফ করে বলতে পারব না। আমার প্রয়াত বন্ধু কবি আবু হেনা মোস্তাফা কামালের গানের কথায়, ‘কবে আমি চোখ মেলেছি স্বপ্নভরা গ্রামে,/ছড়িয়ে আবীর মেঘে মেঘে সন্ধ্যা যেথা নামে।’ জন্ম মৃত্যু বিয়ে ইত্যাদির নিবন্ধন তখন বাধ্যতামূলক কিংবা সহজপ্রাপ্য ছিল না। পাশের গ্রামের পাঠশালার পণ্ডিত মশাই ভর্তির খাতায় যে তারিখটা লিখে রেখেছিলেন সেটা আজো বয়ে বেড়াচ্ছি। তবে সঠিক জানি জীবিকার জন্য সাংবাদিকতা করছি ৬৪ বছর ধরে। এর প্রায় পুরো সময় ধরে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড এবং এখানের জনগোষ্ঠীর কল্যাণ প্রচেষ্টা করে এসেছি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে আমিও প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করেছি। ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমার সহধর্মিণী। অনিবার্যভাবেই বর্তমানে প্রয়াত আমাদের ছেলেমেয়েও ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম সেটাকে দেখতে পাচ্ছি কই?
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখেছিলাম। তাতে বলা হয়েছে, গত মাসে (জানুয়ারি) বাংলাদেশে ৫৬৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন খুন হয়েছেন ১৮ জন। এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৯ জন, র‌্যাব-পুলিশের হাতে বিচারবহির্ভূত খুন হয়েছেন ৩৯ জন, আর একাত্তরের রাজাকার আলবদরদের টেকনিকে গুম, খুন হয়েছেন ৬৫ জন। আট নারীর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এ মাসে। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শিল্পীরা গান গেয়েছেন ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’। মুক্তিযোদ্ধারা এবং দেশের মানুষ অনুপ্রাণিত, উদ্দীপিত হয়েছেন। তারা কি জানতেন যুদ্ধ করে তারা যে দেশটাকে স্বাধীন করলেন সেখানে মানুষের প্রাণের দাম কানাকড়িও হবে না?
জানবেন কী করে? এখন যারা মুক্তিযোদ্ধা বলে সনদ নিচ্ছেন, চাকরি কিংবা মাসে পাঁচ হাজার টাকার ভাতা পাচ্ছেন এবং ছড়ি ঘোরাচ্ছেন তাদের অনেকেরই তখন জন্মই হয়নি। আসলে স্বাধীনতা হাতবদল হয়ে গেছে। কারো কারো আশা ছিল আওয়ামী লীগের ‘হটহেডদের’ পিটিয়ে দিয়ে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবর রহমানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করবেন। হটহেড এবং আওয়ামী লীগের নেতারা রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় চলে গেলেন। কলকাতার হোটেলগুলোতে তাদের অবস্থান, এমনকি যাবতীয় আমোদ-প্রমোদের ব্যয়ও বহন করেছে ভারত সরকার। তারাই এখন অপবাদ দেন বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নয়। অথচ আমরা জানি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, তিনি পালিয়ে বিদেশে চলে যাননি, তার নেতৃত্বে জেড ফোর্স অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করেছিল। আমরা আরো জানি বিএনপির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সাত বছর পরে।

রক্ষক যেখানে ভক্ষক
পুলিশ-র‌্যাব প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সেটা নীতির ও আদর্শের কথা, বাস্তবের কথা নয়। আজকের বাংলাদেশে র‌্যাব-পুলিশকে কেউ জানমালের হেফাজতকারী বলবেন? বরং উল্টোটাই সত্যি। পুলিশ দেখলে, এমনকি পুলিশের কথা শুনলেও নাগরিকেরা আতঙ্কিত বোধ করেন। মিথ্যা মামলায় কেউ ফেঁসে গেলে তো কথাই নেই। এখন আবার পুলিশ বলতে গেলে নিয়মিত গ্রেফতারবাণিজ্য করছে।
আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আপনাকে গ্রেফতার করা হবেÑ এজাতীয় মিথ্যা হুমকি দিয়ে পুলিশ মোটা অঙ্কের ঘুস দাবি করবে। সে ঘুস যদি না দেন তাহলে অযথা আপনাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন ছাড়া পেতে ঘুসের অঙ্ক অনেক বেড়ে যাবে। ঘুস দিতে বিলম্ব হলে সম্ভবত আপনার লাশ পাওয়া যাবে খোলা মাঠে কিংবা বন-বাদাড়ে।
বিগত পাঁচ বছরে পুলিশের সংখ্যা অন্তত দুই কিংবা তিন গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অভিযোগ এদের অনেকেই দেশের একটা দু’টা বিশেষ জেলার লোক। অথবা তারা আওয়ামী লীগের কর্মী বাহিনী কিংবা ক্যাডারের সদস্য ছিল। পাঁচ বছর ধরে তারা সরকারের হুকুমে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করেছে, তাদের গ্রেফতার করে এবং রিম্যান্ডে নিয়ে নির্যাতন করছে। এমনকি গুম-খুনও করছে। সরকার তাদের দিয়ে ঘোরতর অন্যায় করাচ্ছে। সরকারের শত অন্যায় এবং দুর্নীতির প্রত্যক্ষ এবং নীরব সাক্ষী তারা। যখন বিবেকই বিক্রি করে দিয়েছে, তখন দুর্নীতি করে কিছু সম্পদ গড়ে তুলতে ক্ষতি কী? এট হচ্ছে বহু পুলিশেরই মনের কথা। এসব কারণেই বর্তমান বাংলাদেশে চোর, ডাকাত, ধর্ষণকারী কিংবা খুনির বিচার হয় না, বিচারে চড়ানো হয় বেছে বেছে সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের। এ বাহিনীগুলোকে ‘নিরাপত্তারক্ষী’ বলতে আমার জিহ্বায় আটকায়।

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে
কেউ দাঙ্গাবাজি করছে, দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিরোধীদের খুঁজে বেড়াচ্ছে, গুলি করছেÑ এমন ঘটনা ঘটলে পুলিশ তাদের পাকড়াও করবে, শাস্তি দেবে, এটাই হচ্ছে মানুষের প্রত্যাশা। বাংলাদেশে কিন্তু উল্টো কাণ্ড। পুলিশ তাদের প্রশ্রয় দেয়, রক্ষা করে, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে। ছাত্রলীগ যুবলীগকে সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মাথা ফাটানোর কিংবা তাদের হত্যা করার কাজে ব্যবহার করেছে। সরকারের পক্ষের লোকেরাও এখন বলছে, এই সংগঠন দু’টি সরকারের সামালের বাইরে চলে গেছে। এ বোতল থেকে যে দানব ছেড়ে দিয়েছিল সে দানব এখন বোতলে ঢুকে যেতে অস্বীকার করছে, গোটা দেশকেই সে গিলে খাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
প্রতিকার কে করবে? সরকার ও প্রশাসনের ওপর ভরসা বাংলাদেশের মানুষ অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে। শেষ ভরসা বিচার বিভাগ এবং আদালতের ওপর থাকার কথা। বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে দেশে এবং বিদেশে এখন আর কেউ ন্যায়পরায়ণ কিংবা নিরপেক্ষ মনে করে না। কাকে জামিন দেয়া হবে কী হবে না, কাকে কী দণ্ড দেয়া হবেÑ এসব মামুলি বিষয়ও সব সময় নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছার ওপর। দেশের বর্তমান সঙ্কটের উৎপত্তি একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির একটি বিতর্কিত রায়ের কারণে। সে রায়ে ওই বিচারপতি সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। সে বিচারপতি পরে সরকারের কাছ থেকে বাহবা পেয়েছেন। অন্য দিকে একটা সাজানো দুর্নীতির মামলায় যে বিচারক তারেক রহমানকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন তাকে প্রাণের ভয়ে সপরিবারে বিদেশে পালিয়ে যেতে হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। তার গাড়ির ড্রাইভার, এমনকি চাকর-বাকরদেরও হেনস্তা করেছে পুলিশ।

ভবিষ্যতের জন্য প্রতিকূল প্রভাব
আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ করেছিল মূলত ভবিষ্যতের মুখ চেয়ে। দেশের মানুষ শান্তিতে বাস করবে, ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনীদের ভবিষ্যৎ আমাদের চেয়ে ভালো হবে, তারা বড় হওয়ার সুযোগ পাবে ইত্যাদি ছিল আমাদের প্রধান অনুপ্রেরণা। আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে সেকথা কি কারো মনে হবে? ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করবে না, মাস্তানি করে পরীক্ষা পাসের শর্টকাট তারা শিখে গেছে। তা ছাড়া লেখাপড়া করেইবা কী হবে? পরীক্ষার ফি, পকেট খরচ এসব দিতে মা-বাবা হিমশিম খেয়ে যেতেন এককালে। এখন ছাত্রছাত্রীদের অনেকেরই অঢেল টাকা পয়সা। রাজনৈতিক দলের ও নেতাদের হয়ে মাস্তানি করার জন্য তারা ভাড়া খাটে। টেন্ডার বাণিজ্য করে বিস্তর অর্থ তারা কামাই করে। নারী ধর্ষণ তাদের জন্য অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না রাষ্ট্রের পুলিশ ও বিচারকদের কাছে। এই যেখানে উপভোগ্য জীবনের চাবিকাঠি সেখানে খাটাখাটুনি করে আর রাত জেগে স্বাস্থ্য নষ্ট করে পড়াশোনা করতে কে যাবে?
আমাদের কালে বিনয়ী হওয়া, শালীন ও মার্জিত ভাষায় কথা বলা বাধ্যতামূলক ছিল। একচুল নড়চড় হলে চড়-চাপ্পড় অনিবার্য ছিল। আমাদের শৈশবে মা ঘরে ঢুকলে বাবা উঠে দাঁড়াতেন, সন্তানদের সভ্যতা শেখাতে, তাদের জন্য আদর্শ সৃষ্টি করতে। আজকাল আর শিক্ষা এবং আদর্শ বাবা-মায়ের ওপরই নির্ভর করছে না। বহু বাড়িতেই এখন টেলিভিশন আছে। ইচ্ছা থাকলেও টেলিভিশন দেখা থেকে সন্তানদের নিবৃত্ত করা যাবে না। তারা শোনে দেশের যারা মন্ত্রী ও নেতানেত্রী তারা অনর্গল অশ্লীল ভাষায় বিরোধীদের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করছেন, ‘বুলি’ করছেন অন্যদের। মন্ত্রীরা হয়তো মনে করেন কটুকাটব্য করে তারা প্রমাণ দিচ্ছেন যে বাংলাদেশে এখন বাকস্বাধীনতা আছে। ইন্টারনেট প্রযুক্তিও অনেকের সহজপ্রাপ্য। সেখানে ছেলেমেয়েরা পর্নোগ্রাফি দেখছে, আল্লাহ-রাসূল সা: আর ইসলামের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় শুনছে। ভবিষ্যতে এরা বড় হবে, রাজনীতি করা এবং দেশ শাসন করার দায়িত্ব এদের ওপরই বর্তাবে। সেই অনাগত দিনের বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে আপনার মন চাইবে?

সমাধানের যারা অগ্রনায়ক
সমাধান কোথায়? সাহিত্যিক সাংবাদিকেরা সমাধানের প্রধান অগ্রনায়ক হতে পারতেন। সমবেতভাবে তারা লিখে যেতে পারতেন বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রবণতার ভয়াবহতার কথা। বিকল্প পথের আকর্ষণীয় দিকগুলো তারা তুলে ধরতে পারতেন। বিবেককে যারা বেচে দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে সেটা আশা করা অরণ্যে রোদনের শামিল। এখনো যারা বিবেক আঁকড়ে আছেন ভয়ভীতিতে তাদের কলম অবশ হয়ে গেছে। নিজেদের পিঠ এবং প্রাণ বাঁচানো তাদের একটা বড় চিন্তা।
কর্মজীবনের ৩৪টি বছর কাটিয়েছি বিবিসিতে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির সেবা করার অপূর্ব সুযোগ ছিল। অবসর নিয়েছি ২০ বছর হলো। সেসব সুযোগ আর নেই। তবু মিডিয়ার কল্যাণে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ এখনো জনপ্রিয় জেনে আনন্দ হয়। কিন্তু যখন দেখি জীবনের কবিকে মঞ্চের ওপর স্থাপন করে তার পূজা করা হচ্ছে, তখন হৃদয়টা সত্যি বিষণœ হয়। ভাবছি রবিঠাকুরের কবিতাও এখনো পড়া হয় কি না, তার মর্মার্থ কেউ অনুধাবনের চেষ্টা করে কি না। বহু বহু বছর আগে কলকাতার স্কুলে পড়া তার একটি কবিতা আজো প্রায়ই মনে পড়ে। সে কবিতায় কবি তার স্বদেশের কাক্সিত স্বরূপ কল্পনা করে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। কেউ কেউ পড়বেন আশা করে কবিতাটি হুবহু নিচে উদ্ধৃত করছি :‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ুদ্র করি,/যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে/উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে/দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়/অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,/যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি/ বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি-/পৌরুষেরে করে নি শতধা, নিত্য যেথা/তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা,/ নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি পিতঃ, / ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।’

সিরাজুর রহমান
(লন্ডন, ০৪.০২.১৪)
বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান
serajurrahman34@gmail.com

Advertisements