সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে ‘জাতির নানা’ ছদ্দনামের একজন দেশপ্রেমিকের নিজের দেখা অভিজ্ঞতার এটি দ্বিতীয় পর্ব। যাদের হার্টের সমস্যা আছে বা দুর্বল হার্ট তাদেরকে ছবিগুলো না দেখার অনুরোধ করছি। বিডিআর এ সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আসলে যে কি কি হয়েছিলো তা আজো এক বিশাল রহস্য। র‍্যাব অভিযান চালালেও যে বিডিআর বিদ্রোহ দমন করা যেতো, সেই বিদ্রোহকে কেন এতো দূর নিয়ে গিয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষার এতো বড় ক্ষতি করা হলো এটি আজো মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। পড়ুন হুবহু লেখা ‘জাতির নানা’র বর্ণনায় হত্যার বীভৎসতা, যা ভুলে গেছে আমাদের সেনাবাহিনী।

২৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৯; বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশ রাইফেলস এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ সহ ৫৭ জন বিভিন্ন পদবির চৌকশ সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা মহাপরিচালক শাকিলের বাসস্থানে তাঁর স্ত্রীর উপর নারকীয় পৈশাচিক নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করে। কতিপয় দেশদ্রোহীর সহায়তায় পিলখানার দরবার হল থেকে সেনা অফিসারদের বাসস্থান পর্যন্ত অকাতরে গুলি চালিয়ে হত্যা, স্ত্রী সন্তান্দের উপর পৈশাচিক নির্যাতন, হত্যার পর লাশ ড্রেনে ফেলে দেয়া, মাটি চাপা দেয়া এবং পুড়ে ফেলার মত ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। জাতির প্রতিটি মানুষ সে দিন এই আকস্মিক অভাবনীয় হত্যাযজ্ঞের শোকে কষ্টে স্তম্ভিত হয়ে যায়।

নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। সে ঘটনায় মারা যায় তৎকালীন পুলিশের আইজি নুর মোহাম্মদের সদ্য বিবাহিত একমাত্র মেয়ের জামাতা (ক্যাপ্টেন)।

বিপদের সময় মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যায়, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যে, তিন বাহিনীর প্রধানের সামনে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ধরে আকুতি জানিয়েছিলো তার একমাত্র মেয়ের জামাই ও মেয়েকে উদ্ধারের। প্রধানমন্ত্রী তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, “তোমার পদবীর সাথে এমন ইমোশান মানায় না। তোমার মেয়ে ও জামাইর কিছু হবে না।“ তার মেয়ে নির্যাতিত হয়ে জীবিত বের হতে পেরেছিলো কিন্তু মেয়ের জামাই নৃশংসভাবে মৃত্যু বরন করেছিলো।

শোকাহত পরিবাররের মানুষ গুলোর হৃদয়ে এখনও রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। এ ঘটনার পর আজও বিবেকবান সকলের মনে প্রশ্ন বিশেষ করে দেশ প্রেমিক চিন্তাবিদ ও সমরিক বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন –এই হত্যা যজ্ঞ কি মিউটিনি নাকি আভ্যন্তরীণ এবং বহিঃ ষড়যন্ত্রের অংশ? ঘটনার প্রেক্ষাপট, স্থান, ঘটনার গভীরতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, ঘটনা পরবর্তী সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং মিডিয়ার প্রভাব অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই লেখায় আমি শুধু সেই সময়ের নিজের দেখা ঘটনার একটা খুদ্র অংশ প্রকাশ করলাম। ঘটনা সামনে থেকে দেখে নিজের কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজছি।

আচ্ছা, আমাদের সেনাবাহিনী দ্বারা কারা কারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো?

১. শেখ হাসিনা ?

২. শেখ সেলিম ?

৩. তাপস ?

৪. প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ?

উপরের চারটা প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ’

এই ঘটনায় প্রথম তিন বাংলাদেশীর কথা পরে আলোচনা করি। ৪র্থ ক্ষতিগ্রস্থ ভারত। আপনাদের নিশ্চয় রৌমারীর ঘটনা মনে আছে?? ২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিল রাতে বিএসএফ বাংলাদেশের বেশ কিছু ভুখন্ড দখলের উদ্দেশ্যে রাতের আধারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রৌমারীর বড়াইবাডি গ্রামে প্রবেশ করেছিলো দশ প্লাটুন বিএসএফ। তৎকালীন বিডিআর এর বিডিআর মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর তাৎখনাত আদেশ দিয়েছিলেন কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে। সেই রাতে মাত্র বিডিআর দুই প্লাটুন সৈন্য গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে বিএসএফ উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুদিন যুদ্ধ চলে। ফলাফল???

আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন বিএসএফ এর ২২জন, কোন পত্রিকায় ৪০ কোন পত্রিকায় ৭০জন, ৮০ জন এমন বিভিন্ন রকমের তথ্য পেয়েছেন। বিএসএফ নিহতের সঠিক সংখ্যা ভারত সরকারও গোপন করেছে তেমনি বাংলাদেশ সরকারও গোপন করেছে। ঐ ঘটনার পরের দিন অফিসিয়াল কাজে বুড়িমারী গিয়েছিলাম। কাজ সেরে দুপুরের পরে স্থানীয় এক ছেলেকে সাথে নিয়ে রৌমারী বিডিআর ব্যারাকে যাই। সেনাবাহিনীর যে দুজন অফিসারের নেতৃত্বে কাউন্টার অ্যাটাক হয়েছিলো তাদের মুখে ঐ রাতের কথা শুনি। তাদের কথার সারসংক্ষেপ হল এই বিজয়ের ফুল ক্রেডিট বড়াইবাডি গ্রামবাসীর।  গ্রামবাসীরা বিডিআর এর সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে বিএসএফ কচুকাটা করে। বড়াইবাড়ির বিডিআর এর সাথে সেই রাতে যুক্ত হয়েছিলো জামালপুর থেকে কর্নেল শায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত ফোর্স। ঐ দুই অফিসারের ভাষ্য অনুযায়ী দুই ট্রাক বিএসএফ এর মৃতদেহ বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে খুজে খুজে সরিয়ে নেয়। ঐ গ্রামের কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী তিন ট্রাক বিএসএফ এর মৃতদেহ সরানো হয়েছিলো। আসা করি বিএসএফ এর লাশের সংখ্যা অনুমান করতে পারছেন। রাতের আধারে অপরিচিত টেরিটোরিতে ঢুকে বিএসএফ বিডিয়ার এর অতর্কিত অ্যামবুশে পড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো। সেইসাথে গ্রামবাসীর দা কুড়ালের আক্রমনের শিকার হয়েছিলো। দুদিনের যুদ্ধে বেশকিছু গ্রামবাসী ও কয়েকজন বিডিআর আহত হয়েছিলো। বেশ কিছু ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিলো বিএসএফ। চারজন দেশপ্রেমিক বিডিআর শহীদ হয়েছিলো সেদিন। সেই ঘটনার জের ধরে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর চাকরী হারিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। শেখ হাসিনা বিডিআর সদস্যদের ধন্যবাদের বদলে শাসিয়েছিলেন বলে গ্রামবাসিরা অভিযোগ করে।

এই ঘটনা বলার পিছনে কারন আছে। পরের পর্বগুলোতে এর ব্যাখ্যা দিব। যদিও আপনারা এর নেপথ্য জানেন।

এর বাইরেও মনের ভিতর কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায় যার উত্তরগুলো এখনো আমার অজানা। এই ঘটনার পুনঃতদন্ত হলে এইসব প্রশ্নগুলো সামনে আসবেঃ

১. আমার মত একজন সাধারন নাগরিক যখন সকাল ৯টার এর মধ্যে জেনে যায় ৩৭ জন অফিসার মারা গেছে সেখানে সকাল ১১টায় প্রধান মন্ত্রী কি করে সাংবাদিকদের বলেন, পিলখানার অভ্যন্তরে হতাহতের কোন খবর জানেন না!!!!!!

২. পিলখানায় মুল হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় মাত্র ১২ জন। যারা ৯:১৫ মিনিটের মধ্যে পোশাক পরিবর্তন করে বের দেয়াল টপকিয়ে হাজারীবাগ এলাকা দিয়ে বের হয়ে যায়। তাদেরকে ২টি এম্বুল্যান্সে এয়ারপোর্টে পৌছে দেওয়া হয়। দুইটা পুলিশের গাড়ি এস্করট করে তাদের বিমান বন্দরের ভিয়াইপি গেইট দিয়ে ধুকানো হয়। কার নির্দেশে সেই দিন বিমানে ফ্লাইট ৩০ মিনিট দেরি করে? কারা ঐ দিন বিমান বন্দরের নিরাপত্তায় ছিলো?

৩. সকাল ৭টায় রংপুর থেকে এক ডিজিএফাই এর এক মেজর পিলখানায় তার বন্ধুকে ফোন করে বলে, “বাচতে চাইলে পিলখানা থেকে এখনই বের হয়ে যা।” পিলখানার অফিসারটি তাৎক্ষনাত বের হতে না পারলেও ঘটনার পরে জীবিত অবস্থায় বের হয়!!!- এই কথা বলছি এই কারনে যে ডিজিএফাই এর একটা অংশ এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো???

৪. ঘটনার পরের দুমাসের ভিতর কতজন অফিসার ক্যান্টমেন্টের অভ্যন্তরে অপঘাতে বা দুর্ঘটনায় মারা যায়??? একজন মারা যায় হেলিকাপ্টার এক্সিডেন্টে। এদের অধিকাংশই সারভাইবাল বা পিলখানা থেকে জীবিত ফেরত এসেছিলো। CMH এ চিকিৎসারত অবস্থায় কয়জন অফিসারের স্মৃতিভ্রম হয়েছে??? সেনাকুঞ্জে সেসব অফিসার শেখ হাসিনার সাথে উদ্যত আচরন করেছিলো তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো???

৫. সারা দেশ থেকে আগত কয়েক হাজার বিডিআর জওয়ানকে আটক করার পর ৬০ জনের মত জওয়ান হার্ট অ্যাটাকে বা গলায় গামছা পেচিয়ে মারা যায়!!! এরা কি ঘটনার পিছনের আসল ঘটনা জানতো???

৬. কর্মরত ডিবি, র‍্যাব, পুলিশ বা ডিজিএফআই কে ইনভল্ব না করে কি কারনে আবসরে যাওয়া ডিবির আবুল কাহার আকন্দকে ডেকে এনে এর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো??? এই ফরমায়েশি তদন্তকারী কি হত্যার আলামতগুলো হেফাজত করেছেন নাকি চিরতরে শেষ করে দিয়েছেন?? সিসি টিভির ফুটেজগুলো কি সংরক্ষণে রেখেছেন নাকি আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন???

৭. সারভাইবালদের থেকে কাকে কাকে পুরুস্কিত করা হয়েছিলো??? এমনও দেখা গেছে মেজর পদমরর্যদার কাউকে ইউএন মিশনে দৈনিক ১৮০ ডলার বেতনের লোভনীয় পদে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিলো!!!!! সচারাচর এধরনের বেতনে পাঠানো হয় কর্নেল/ব্রিগেডিয়ার পদমরর্যদার কাউকে!!! এমনভাবে পুরস্কৃত করার পিছনে বিশেষ কোন কারন নাই তো???

শেখনিউজ রিপোর্ট

Advertisements