বিষয়টি প্রথমে আমি বুঝতেই পারিনি। যখন পারলাম, তখন একটার পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। হঠাৎ করেই এক দিন টের পেলাম- মাথাটা ভীষণ চুলকাচ্ছে। মনে করলাম হয়তো খুশকি হয়েছে কিংবা মাথার চামড়ায় কোনো এলার্জি দেখা দিয়েছে। ভালো শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার করলাম এবং খুশকিরোধক কিছু ওষুধ মাখলাম। কোনো কাজ হলো না। উল্টো মাথার চুলকানি বেড়ে গেল। ডাক্তার দেখালাম। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সার্টিফিকেট পেলাম যে, মাথার চামড়ায় কোনো এলার্জি নেই।
তা হলে কী হতে পারে! এত চুলকাচ্ছে কেন! নিশ্চয়ই উকুন হয়েছে। বাজার থেকে উকুননাশক সাবান আনলাম। কাজের কাজ কিছু হলো না- মাঝখান থেকে কিছু চুল পড়ে গেল এবং চুলকানি বেড়ে গেল। বিষয়টি নিয়ে স্ত্রীর সাথেও পরামর্শ করতে পারলাম না। কারণ তার মাথায় কোনো উকুন নেই। সে যদি প্রশ্ন করে বসে তোমার মাথায় উকুন এলো ক্যামনে- তা হলে বেইজ্জতির কোনো সীমা থাকবে না।
ছোটকাল থেকে জানতাম বান্দর নাকি খুব ভালো উকুন বাছতে পারে। সত্য-মিথ্যা জানি না। কিন্তু শৈশবের ধারণাটি বহন করে চলছিলাম ধারাবাহিকভাবে। মনে মনে চিন্তা করলাম দেখি বান্দর দিয়ে কিছু করানো যায় কি না! আর সবশেষ চিকিৎসা মাথা টাক করা আমার একেবারেই অপছন্দ। এখন সমস্যা হলো বান্দর কোথায় পাই? সাধারণ বান্দর হলে চলবে না। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। অনেক সময় বিভিন্ন পার্কে কখনো কখনো দু-একজন লোককে দেখা যায়, যারা বান্দরনাচ দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করেন কিংবা নানা টুটকা কবিরাজি ওষুধপত্র বিক্রি করেন।
আমি বেরিয়ে পড়লাম- বান্দরের খোঁজ্ েরমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে একটি নাদুসনুদুস দুষ্ট বান্দরের সন্ধান পেলাম ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। সময়টা ছিল বিকেল বেলা। বান্দরের মালিক ডুগডুগি বাজিয়ে বিভিন্ন রকম দুর্বোধ্য বাক্য উচ্চারণ করছেন। আর মালিকের হুকুমের সাথে তাল মিলিয়ে বান্দরটি ধ্যাতাং ধ্যাতাং করে নাচছে। আমি মাথার চুলকানি ভুলে অনেকক্ষণ ধরে সেই খ্যামটা নাচ দেখলাম। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর নাচ শেষ হলো। দর্শকেরা যে যার মতো চলে গেলেন। দাঁড়িয়ে রইলাম আমি আর বান্দরের মালিক। আমি এগিয়ে গিয়ে লোকটির সাথে মোলাকাত করলাম এবং লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে মনের কথা খুলে বললাম।
তিনি তো ভারী অবাক- নাম তার টিডিক্কা। সারা জীবনে এমনতর অদ্ভুত প্রস্তাব শোনা তো দূরের কথা, হয়তো কল্পনাও করেননি। একজন প্যান্টশার্ট পরা  ভদ্রলোক তার কাছে এসেছেন বান্দর দিয়ে মাথার উকুন বাছানোর জন্য- এ-ও কি সম্ভব। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে তার পর বললেন- আচ্ছা ঠিক আছে, কাল সকালে আমার বস্তিতে আসুন। আমি বস্তির ঠিকানা ও লোকেশন ভালোভাবে জেনে নিলাম। বান্দরটির হাতে ১০০ টাকার একটি নোট গুঁজে দিলাম এবং মালিকের হাত ধরে বললাম- ভাই কথাটা কাউকে বলবেন না। ভদ্রলোক মুচকি হাসি দিয়ে বললেন- কাউকে বলব না কেবল স্ত্রী ছাড়া। আমি আবার আমার স্ত্রীকে কোনো কথা না বলে একদম থাকতে পারি না।
নির্দিষ্ট সময় আমি বস্তিতে উপস্থিত হলাম এবং জনাব টিডিক্কার ঘরে পৌঁছলাম। ছোট ছোট দুটো মেয়ে শিশু এবং সুন্দরী একটি বউ নিয়ে তার সুখের সংসার। আমি ঘরে ঢোকার সাথে সাথে গৃহকর্ত্রী ফুলবানু দরজা বন্ধ করে দিলেন। তাদের কথামতো মাথায় আচ্ছা মতো নারকেল তেল মাখলাম। এরপর শুরু হলো বান্দরের উকুন মারা। অসম্ভব দক্ষতার সাথে বান্দরটি তার কর্ম করতে থাকল। আবেশে আমার ঘুম চলে এলো। কিন্তু ঝিমুনি আসতেই বান্দরটি এমন একটি কর্ম করত, যাতে আমার ঘুম ভেঙে যেত। ওটি ছিল যথেষ্ট দুষ্ট ও পাজিপ্রকৃতির বান্দর। আমি যখন ঝিমিয়ে পড়ছিলাম, ওটি তখন সজোরে আমার কান মলে দিচ্ছিল আর শিশুরা সব খিলখিলিয়ে হেসে উঠছিল। দু-একবার আমার একটু অভিমান হলো, পরে দেখলাম- বান্দরের কানমলা খেতে বেশ ভালোই লাগে।
ঘণ্টা দুয়েক ধরে বান্দরটি তন্ন তন্ন করে আমার মাথার উকুন খুঁজল। কিন্তু পেল না একটিও, এমনকি একটি উকুনের বাচ্চা বা ডিমও পেল না। আমি হাজারখানেক টাকা বখশিশ দিয়ে ফিরে আসার আগে ফুলবানুর হাতের চা-নাশতা খেলাম এবং তার ছোট্ট শিশু দু’টিকে কোলে তুলে আদর করে দিলাম। ফিরতি পথে টের পেলাম আমার চুলকানি বেশ কমেছে কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়নি। বহুদিন পর সে রাতে আমার চমৎকার একটি ঘুম হলো। ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখতে পেলাম- স্বপ্নে সৌম্য দর্শন এক স্বর্গীয় পুরুষ আমার সামনে এলেন। তার পর পরম স্নেহে আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। আমি সম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালাম এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনতে লাগলাম।
আমার স্বপ্নপুরুষ বললেন- প্রিয় বৎস! নিশ্চয়ই তুমি কয়েক দিন ধরে তোমার মাথার চুলকানি নিয়ে মহাফ্যাসাদে আছো। আজকের পর থেকে তোমার চুলকানি বন্ধ হবে। কিন্তু পরবর্তী সাত দিন তোমার পেট সর্বদা পুট পুট করবে- ভীষণ পুট পুট। তোমার মনে হবে একটু বায়ু ত্যাগ করতে পারলে বোধ হয় তুমি প্রাণে বেঁচে যাবে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তুমি পেটের পুটপুটানি যেমন বন্ধ করতে পারবে না, তেমনি বায়ু ত্যাগও করতে পারবেন না। ওষুধপত্র খাওয়া কিংবা চেষ্টা-তদবির যত বেশি করবে, ততই বিপদ বাড়বে এবং পুটপুটানি অসহ্য মনে হবে। সাত দিন পর সব কিছু এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে আর তুমি প্রবেশ করবে অন্য এক নতুন ভুবনে।
স্বপ্নপুরুষের সৌম্য দর্শন আর ছন্দময় প্রকাশভঙ্গিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম। অতীব বিনয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- মহাত্মন কেন এত্তসব ঝামেলা আমার জীবনে এলো এবং এর পরিণতিতে কী-ই-বা এমন অনন্য ভুবন পাবো। মাথার চুলকানি ও পেটের পুটপুটানির মাজেজাই বা কী? তাত্ত্বিক পুরুষ হাসলেন- তার পর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন- বৎস তুমি এক মহান বুদ্ধিজীবী হতে যাচ্ছো! তোমার বুদ্ধির ঝলকে দেশের সব রাজা-বাদশাহ চমকিত হবেন। বুদ্ধির পরিমাণ এত বেশি হবে যে তা মস্তিষ্ক ছাড়িয়ে তোমার পেটের মধ্যে ঢুকে পড়বে। যেকোনো সুস্বাদু খাবার পেটে ঢুকলে প্রথম প্রথম হজমে একটু গরল বা গরমিল হয়।  তাই বুদ্ধির মতো মহামূল্যবান ও অতি উপাদেয় জিনিস মাথার সীমা অতিক্রম করে পেটে প্রবেশ করলে পুটপুটানি অতি স্বাভাবিক।
আমি শুনছিলাম এবং উত্তেজনায় ছটফট করছিলাম- বললাম হুজুর! বুদ্ধিজীবী হয়ে আমার লাভ কী? তিনি এবার উচ্চস্বরে হাসলেন। পিঠ চাপড়ে আদর করে বললেন- অনেক লাভ। তুমি যদি প্রতিদান পেতে চাও আখিরাতে, তা হলে নির্ঘাত বেহেশত। আর যদি দুনিয়ার প্রতিদান একেবারে আশা না করো, তবে মানুষের মাঝে তুমি অমরত্ব লাভ করবে ঠিক সক্রেটিস, প্লেটো, কনফুসিয়াস, শেখ সাদি কিংবা জালাল উদ্দিন রুমির মতো। কিন্তু তোমার জিহবা যদি রসালো হয়- তোমার ত্বক যদি নিত্যনতুন নরম জিনিসের আকাক্সায় ইতিউতি করে কিংবা তোমার চোখ যদি কেবল বড় বড় ইটপাথরের সুরম্য অট্টালিকার দিকে নিবন্ধিত হয়- সে ক্ষেত্রে তুমি পাবে ভিন্নমাত্রার সফলতা।
কেন জানি বাকিতে কাজ কারবার আমি পছন্দ করি না। আমার আব্বা করতেন না। সব কিছুতে নগদ নারায়ণ না হলে আমি অস্থির হয়ে পড়ি। মনের অভিব্যক্তিকে গোপন রেখে আমি স্বপ্নপুরুষের কাছে জানার চেষ্টা করলাম কিভাবে নিজের বুদ্ধিকে ব্যবহার করে নগদ-ছগত কিছু পাওয়া যায়- প্রাপ্তির জায়গা যদি রাজদরবার কিংবা বেশ্যালয় হয়, তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি শুধু চাই- টাকা, পয়সা, ধনদৌলত, গাড়ি-বাড়ি, পদপদবি, নারীসহ আরো সব ভোগের সামগ্রী। আমার খুব ইচ্ছে হয় দামি দামি মদ খেতে, কিন্তু গাঁজা, তাড়ি, চরস এসব একদম পছন্দ করি না। মাঝে মধ্যে বিনোদনের জন্য নাচগান সাথে একটু তাস-পাশা-জুয়া হলে মন্দ হয় না।
ব্যক্তিজীবনে আমি গর্দভদের বাদশাহ। বুদ্ধিশুদ্ধি নিম্নমানের, বংশ-টংশও ভালো না, খারাপ কাজ করার খুবই ইচ্ছা কিন্তু সুযোগ না পাওয়ার কারণে করতে পারিনি তেমন কিছু। তাই বদনামি এখনো আমাকে পেয়ে বসেনি। আমার অর্থবিত্ত নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও অল্প। বছরখানেক আগে নীলক্ষেত থেকে একটি তত্ত্ব ডক্টরেট ডিগ্রির ভুয়া সার্টিফিকেট জোগাড় করেছি। ওটা যে নকল, তা প্রমাণ করার সাধ্যি কারো বাপের নেই। এরপর রাজদরবারের কিছু কর্তাব্যক্তির তোষণ-পোষণ করে দু-একটি টেলিভিশনে বক্তা হিসেবে গেছি- আমার গলার স্বর মিনমিনে- মেয়ে মানুষের মতো। ছোটকালে সহপাঠীরা আমাকে মিনমিনে শয়তান বলত। আবার কেউ বলত ম্যানা চোট্টা। সেই আমি নিজের অবদমিত মনে বুদ্ধিজীবী হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, তা এক অলৌকিক শক্তি বলে মনে হচ্ছেÑ পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে! স্বপ্নের ঘোরে থেকেও আমি আমার লক্ষ্য স্থির করা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম।
আমি স্বপ্নপুরুষকে বললামÑ হে মহাপুরুষ, আপনি শিখিয়ে দিন কিভাবে আমি আমার পাি ত্য জাহির করব? কিভাবে আমি ক্ষমতাসীন লোকদের কাছে অতি চড়ামূল্যে আমার বুদ্ধি বিক্রয় করব? আমার পোশাক-আশাক, চালচলন, বাচনভঙ্গি, চাহিদা ও আচার-আচরণ কিরূপ হবে? কিভাবে আমি ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি হবো? কিভাবেই বা আমি তাদের সাথে লেগে থাকব, কারণ ওরা তো আগুনের মতো, কাছে গেলে পুড়িয়ে মারে। পান থেকে চুন খসলেই আর রক্ষে নেইÑ যে হাত দিয়ে ওরা আমাকে লালন করবে, সেই হাত দিয়েই গলা টিপে মেরে ফেলবে!
আমার কথাগুলো শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। তার পর বললেনÑ ধৈর্য ধরো বৎস, আমি তোমাকে সব কথা বলব। শিখিয়ে দেবো সব কলাকৌশল, এমনকি নারীদের পটানোর ব্যাপার-স্যাপারও। তার পর তুমি সিদ্ধান্ত নেবেÑ আসলে তুমি কী করতে চাও বা আসলে তুমি কিছু করতে পারবে কি না। যেকোনো ভালো কাজ করতে যেমন জন্মগতভাবে কিছু কিছু ভালো জিনিসের দরকার হয়, তেমনি মন্দ কাজ করার জন্য দরকার হয় সেই রূপ বদ খাসলত। তুমি যে কাজ করতে চাচ্ছো তা হলোÑ প্রতারণা, ভ ামি, মিথ্যাচার, মুনাফেকি, তেলবাজি, ভাঁওতাবাজি এবং অন্যকে বোকা বানিয়ে স্বার্থ হাসিল। এগুলো সবই মন্দ কাজ।
মানুষ সহসাই মন্দ কাজ করতে পারে না। মন্দ কাজের খলনায়কের দুটো প্রধান গুণে গুণী হতে হয়। এক. তাকে অবশ্যই হারামজাদা হতে হবে; দুই. তাকে হারামখোর বা হারামি হতে হবে। আমার কথা শুনে তুমি হয়তো বিস্ময়ে তোমার চোখ গোল গোল করে ফেলেছো। কিন্তু আমি যদি সব কিছু খুলে বলি তবে তুমি বুঝতে পারবে এবং সে মতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। জীবনে অনেক লোক না বুঝে ভালো ভালো কাজ করে ফেলে আবার তেমনি না বুঝেই মন্দ মন্দ কাজ করে থাকে। ফলে সেই সব লোক তাদের কৃতকর্মগুলো হজম করতে পারে না এবং কর্মের ভারও বহন করতে পারে না। এ কারণে লোকগুলোকে সারা জীবন আফসোসের সাথে মর্মবেদনায় দিনগুজার করতে হয়। আমি চাইÑ তোমার জীবন যেন ওরকম না হয়।
হারামজাদা ও হারামি শব্দ দুটো শোনার পর আমার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পেরে বললেনÑ শান্ত হও বৎস! তোমাকে ভালো করে জানতে হবে হারামজাদা ও হারামি কাকে বলে! সাধারণত পিতার অবৈধ সন্তানকে হারামজাদা বলা হলেও শব্দটির বহুমাত্রিক অর্থ রয়েছে। যে লোকের পিতা সারা জীবন হারাম কাজ করত তাকে সহজেই হারামজাদা বলা যায়। এসব লোকের পক্ষে অনায়াসে, নির্দ্বিধায় ও অতিসহজে যেকোনো খারাপ করা কোনো ব্যাপারই না।  অন্য দিকে হারামি বলা হয় তাকেই যে সর্বদা নিজেকে হারাম কাজে ব্যাপৃত রাখেÑ এ ক্ষেত্রে সে হারামজাদা না হয়েও দক্ষতার সাথে হারামিপনা চালিয়ে যেতে পারে।
বুদ্ধিমান হিসেবে নিজেকে তারাই প্রতিষ্ঠিত করে ক্ষমতাসীনদের নেকনজর লাভ করতে পারবে। যারা অতি সতর্কতার সাথে নিজের হারামিপনা গোপন রাখতে পারবে। মনে কুপ্রকৃতি আর ওপরে ওপরে ভালোমানুষীর ভোল তুলে এসব লোক হেলেদুলে এগিয়ে যায় কাক্সিত লক্ষ্যের দিকে। এরা অদ্ভুত  সব পোশাক পরে। অশালীন নয়Ñ তবে অদ্ভুত। এরা লম্বা লম্বা চুল রাখে। কেউ কেউ নিজের বিশেষত্ব দেখাবার জন্য চুলে ঝুটি বাঁধে। এদের কেউ কেউ বড় বড় মোচ রাখে এবং বাহারি সব মসলা দিয়ে মোচে  তা দেয়।
নকল বুদ্ধিজীবীর প্রধান লক্ষ্য থাকে চমক লাগানো কথাবার্তা বলা এবং ব্যক্তিবিশেষ বা মহলবিশেষের পক্ষাবলম্বন করা। এ কাজ তারা করে কখনো আদিষ্ট হয়ে, আবার কখনো করে কাক্সিক্ষত ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। এরা প্রথমে একাকী ঘোরে এবং একাকী কর্ম করে। কিন্তু অতি অল্পসময়ের মধ্যে তারা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে যায়। স্বপ্নপুরুষ এ পর্যন্ত বলে আমার দিকে তাকালেন। মনে হলো তিনি আমার অন্তরের কথা বুঝতে পেরেছেন। কারণ এতক্ষণ তার কথা শোনার পর আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছিলÑ কিভাবে ও কত দ্রুত বুদ্ধি বিক্রি করে কিংবা বিবেক বন্ধক রেখে ক্ষমতাবানদের কাছাকাছি হওয়া যায় এবং স্বার্থ হাসিল করা যায়?
আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে স্বপ্নপুরুষ বললেনÑ তোমাকে নতুন কিছু করতে হবে। সব সময় একটা ভাব ধরে থাকতে হবে। তুমি যার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাও, তার পক্ষে এমন সব কথা বলতে হবে, যা কেউ সচরাচর বলে না। তোমার বক্তব্য যদি তার কানে পৌঁছায়, তবে সে তোমাকে ডাকবে। অন্য পথটি আরো সোজা কিন্তু একটু বেহায়াপনা থাকতে হবে। তুমি তার সাথে খাতির করো যে কিনা কাক্সিক্ষত জায়গায় নিয়মিত যায় এবং পিঠাপায়েস খায়। এ কাজ করতে গিয়ে তুমি তোমার গুরুকে উপহার প্রদান করো। সবচেয়ে দামি এবং কার্যকর উপহার হলো সুন্দরী স্ত্রী কিংবা মেয়ে। ক্ষেত্রবিশেষে ভগ্নিও হতে পারে।
সবই তো বুঝলামÑ কিন্তু বুদ্ধিজীবী হয়ে নারী পটাবো কেমনে! স্বপ্নপুরুষ বললেনÑ আজ আর নয় অন্য এক দিন। রাত এখন শেষ প্রহরের কাছাকাছি। কিছুক্ষণ পর সুবিহ সাদিক হয়ে যাবে। নিকটতম আসমানে রহমতের ফেরেশতারা চলে আসবে। কাজেই তার আগেই আমাকে চলে যেতে হবে। যাওয়ার বেলায় বলে যাচ্ছি আমার কথাগুলো হয়তো তোমার স্মরণে থাকবে। তুমি চেষ্টা করতে থাকো। যদি সফল হতে পারো তবে আরো নতুন কিছু বলার জন্য আমি আবার আসব। এরপর স্বপ্নপুরুষ চলে গেলেন।
আমার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসলাম। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে যদিও দেশে শীতকাল চলছে। উঠে বাথরুমে গেলাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম, পেটে পুটপুটানি শুরু হয়ে গেছে। আনন্দে আত্মহারা হওয়ার উপক্রম হলো। তা হলে সত্যিই কি আমি সিদ্ধিলাভ করেছিÑ সত্যিই কি আমি অলৌকিকভাবে বুদ্ধিজীবী হয়ে গেছি। এ কথা ভাবতে ভাবতে আয়নার সামনে দাঁড়ালামÑ এ কী দেখছি আমি? এই প্রতিচ্ছবি কি আমার, না অন্য কারো?

গোলাম মাওলা রনি সাবেক সংসদ সদস্য
নয়াদিগন্ত, ১১-০২-১৪

Advertisements