রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ ছাত্র সমাবেশে রোববার প্রকাশ্য ছাত্রলীগের নেতাকর্র্মীরা যে পিস্তল ব্যবহার করেছে তা এখনও উদ্ধার হয়নি। ঘটনার দুইদিন পার হলেও আটক করা হয়নি কোনো অস্ত্রধারী ক্যাডারকে। ওই দিনের ঘটনায় ছাত্রলীগের অস্ত্রের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।  এদিকে ছাত্রলীগের অপকর্ম ঢাকতে একের পর এক সাজানো হচ্ছে বহিষ্কার নাটক। বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ একাধিক নেতাকে এর আগেও বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের পরে ছাত্রলীগের নেতারা আরও হিং¯্র হচ্ছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেলেও তারা থাকছেন আইনের উর্ধ্বে।

অস্ত্রবাজদের পরিচয়:

রাবি শিক্ষার্থীদের উপর রোববারের হমলায় যারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে তাদের সবাই ছাত্রলীগ পদধারী নেতা বলে জানা গেছে। তবে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত অস্ত্রধারী কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে যে পাঁচজনের পরিচয় জানা গেছে তাঁরা হলেন-রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ রুনু, যুগ্ম সম্পাদক নাসিম আহাম্মেদ সেতু, সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমন, পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মুস্তাকিম বিল্লাহ এবং বিগত কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সুদীপ্ত সালাম।

সালাম: রোববার রাবি ছাত্রলীগের আগের কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সুদীপ্ত সালামকে লাল টি-শার্ট পরে শিক্ষার্থীদের দিকে অস্ত্র উচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনেক আগেই বিবিএ পাশ করলেও এখনো এমবিএ ভর্তি হননি। সালামের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডে। গত বছরের ২১ এপ্রিল সালামকে নগরীর সাধুর মোড় এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে পিস্তল ও কলগার্লসহ আটক করে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ। এর আগে ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালে ছাত্রদলকর্মী আহসানুজ্জামান অলিন ও মতিহার থানার এক পুলিশ কনস্টেবলকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনায় দুটি মামলা রয়েছে। এছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদেরক মারধর, শিক্ষক-সাংবাদিক লাঞ্ছিতসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে সালামের বিরুদ্ধে।

ফয়সাল: অস্ত্রধারীদের মধ্যে রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহাম্মেদ রুনুকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পুলিশের সামনেই তাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তিনি কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌর মেয়রের ছেলে হওয়ার সুবাদে ক্যাম্পাসে প্রচন্ড দাপটে চলেন এ নেতা। এর আগেও ক্যাম্পাসে একাধিক বার বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপর প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা যায় তাকে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

নাসিম: রাবি ছাত্রলীগের ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সম্পাদক নাসিম আহাম্মেদ সেতু। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। পরীক্ষায় বসতে না পারায় গত বিভাগ থেকে তার ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। নাসিম ২০১২ সালের ২ অক্টোবর অস্ত্র উঁচিয়ে শিবিরকর্মীদের উপর গুলি ছোড়েন। এ ছবি পরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গত বছর ৩১ জানুয়ারি নাসিম নিজ সংগঠনের এক কর্মীকে অস্ত্র দেখাতে গিয়ে গুলি বের হয়ে নিজেই আহত হয়েছিলেন। গত রোববার ছাত্রলীগের মিছিল থেকে নাসিম আহাম্মেদকে পিস্তল হাতে গুলি করতে করতে দৌড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের দিকে যেতে দেখা গেছে।

ইমন: রোববার ছাই রঙের জ্যাকেট পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমনকে। তিনি ইতিহাস বিভাগের মার্স্টাসের শিক্ষার্থী। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমির আলী হল শাখার সভাপতি ছিলেন। তার বাড়ি পাবনা জেলায়।

বিল্লাহ: আকাশি রংয়ের জ্যাকেট ও সাদা টি-শার্ট পরে রোববার রাবি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মুস্তাকিম বিল্লাহকে পিস্তল হাতে দেখা গেছে। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এছাড়াও হামলার সময় অস্ত্রহাতে আরও একজনকে দেখা গেলেও তার পরিচয় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের পশ্চিম পাশের আমবাগান এলাকায় অস্ত্র হাতে এই যুবককে দেখা যায়।

উদ্ধার হয়নি ছয় পিস্তল:

রোববার সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলার সময় ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতে পিস্তল দেখা গেছে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রত্যাক্ষাদীর্শরা এদের মধ্যে পাঁচটি পিস্তল সনাক্ত করেছেন। এসব পিস্তল দিয়েই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অন্ততপক্ষে ৪০-৫০ রাউন্ড গুলি বর্ষন করে। ঘটনার পরের দিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বরে এসব ছাত্রলীগ ক্যাডাররা অস্ত্রসহ ঘোরা-ফেরা করলেও কাউকে আটক করতে বা কোন পিস্তল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

যেভাবে আসে অস্ত্র:

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, এক সময় এসব অস্ত্র পাওয়া যেত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের যে অস্ত্র রয়েছে তার অধিকাংশই নেতাকর্মীদের কিনতে হয়েছে। ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির আরও কয়েকজন জানিয়েছেন, বর্তমানে ছাত্রলীগের অধিকাংশই রাজশাহী ও আশপাশের অঞ্চল থেকে কেনা। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবঞ্জের সীমান্ত এলাকা, রাজশাহীর বাঘার সীমান্ত এলাকা ও নাটোর থেকে এসব অস্ত্র কিনে থাকে তারা। জানা যায়, ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সর্বশেষ কাউন্সিলের আগে ছাত্রলীগের সভাপতি প্রার্থী শরিফুল ইসলাম শরিফ অস্ত্র কিনতে গিয়েছিলেন বাঘা উপজেলায়। সেখানে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন তিনি। পরে কিছুদিন কারাবাসের পর মুক্তি মেলে তার।

অস্ত্রের দাম, নাম ও টাকার উৎস:

ছাত্রলীগের কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানায়, বর্তমানে দলের নেতাকর্মীর কাছে যেসব অস্ত্র আছে তার বেশির ভাগই বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্র। ২০টি মত রয়েছে সেভেন পয়েন্ট সিক্স ও নাইন এমএম পিস্তল। এগুলো প্রত্যাকটির দাম ৫০-৬০ হাজার টাকা। দলের প্রথম সারির ক্যাডাররা এসব অস্ত্র ব্যাবহার করে। এছাড়াও ছাত্রলীগের কাছে রয়েছে দেশি পয়েন্ট টু-টু, ওয়ান শ্যুটার এবং সাক্কা। এগুলো ১০-১২ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। ছাত্রলীগের দ্বিতীয় সারির নেতাদের কাছে রয়েছে এসব অস্ত্র। এছাড়াও রাবি ছাত্রলীগের কাছে রয়েছে থ্রি নট থ্রি ওয়ান সুটার।

রাবি ছাত্রলীগের বহিষ্কার নাটক:

হত্যা, সংঘর্ষ, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অস্ত্র প্রদর্শন, শিক্ষক, সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার দায়ে গত পাঁচ বছরে রাবিতে শাখা ছাত্রলীগের অন্তত ৩০ নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কার করার কিছুদিনের মধ্যেই অধিকাংশ নেতাকে স্ব পদে ফিরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। মূলত মিডিয়া এবং জনগনের চোখ আড়াল করা জন্যই এ বহিষ্কার নাটক করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন, সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক এবং রোববারের ঘটনার জন্য বহিষ্কৃত নাসিম আহম্মেদ সেতুকে এর আগেও বহিষ্কার করা হয়েছিল। সর্বশেষ গত রোববার সংঘর্ষের সময় প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোঁড়ার ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সোমবার রাতে রাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক নাসিম আহাম্মেদ সেতু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমনকে কেন্দ্রীয় কমিটি বহিষ্কার করে।

উল্লেখ্য, বর্ধিত ফি ও সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের দাবিতে রোববার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশ হামলা চালায়। এতে শিক্ষার্থী-সাংবাদিকসহ দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সন্ধ্যা সাতটায় সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বিভিন্ন মহলের বক্তব্য:

ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন বলেন, যদি কেউ আঘাত করতে আসে সেই ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেরা প্রতিরোধ গড়ে  তোলে মাত্র। রোববারের ঘটনাকে অনাকাঙ্খিত দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের ভেতর যারা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের বহিষ্কার করেছে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার প্রলয় চিচিম বলেন, আমরা টেলিভিশন ও পত্রিকার নিউজ, ভিডিও ফুটেজ থেকে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। তাদের গ্রেফতার এবং সংঘর্ষে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মিজান উদ্দিন বলেন, রোববারের ঘটনার পরিপেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় জরুরি সিন্ডিকেটে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জড়িতদের ব্যাপারে তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

http://www.sheershanews.com/2014/02/04/24750

Advertisements