আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতার কথা আজকাল বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের লোক প্রায়ই সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে থাকেন। এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা মূলত সেকুলার বা বাম ধারার। তাদের জীবনের ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে, দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা বা দূর করা। তবে তারা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অনেক কথা বললেও এ কথা বলে না যে, কাদের বিরুদ্ধে এই অভিযান এবং তারা সরাসরি স্পষ্ট করে বিষয়টি প্রকাশও করেন না। তাদের কাছে মনে হয়, একটি অব্যাখ্যাত শব্দের আড়াল থেকে বক্তব্য দেয়াই সহজ। বলাও হলো, আবার কেউ সরাসরি ধরতে পারল না— কার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে।

তবে তাদের সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো ইঙ্গিতপূর্ণ। আমরা সহজেই সেসব বক্তব্য বা কথাবার্তা থেকে এটা অনুমান করতে পারি যে, এসব সাধারণভাবে ধর্ম ও ধর্মীয় শক্তির বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে বিশেষভাবে তা ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে। তারা কি এর দ্বারা সহনশীলতা বোঝান? অসহিষ্ণুতা দূর করতে চান? প্রকৃতপক্ষে এসব লোকের আচরণই সবচেয়ে অসহিষ্ণু। ধর্ম তো কোনোভাবেই অসহিষ্ণুতা প্রচার করে না, কিংবা অসহিষ্ণুতার সপক্ষে কথা বলে না। অন্তত এ যুগে তো নয়ই। ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সহনশীলতা, সহমর্মিতার কথাই বলে। ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। স্বাধীন ধর্মচর্চার পক্ষেই কথা বলে। কিন্তু কিছু লোক ‘সাম্প্রদায়িকতা’র বিরুদ্ধে কথা বলে প্রকৃতপক্ষে ধর্মের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে ধর্মীয় সংঘাতে লোক মারা যায়নি বা গুটিকয়েক লোক মারা গেছে, যার থেকে শত গুণ বেশি মারা গেছে রাজনৈতিক সংঘাতে বিভিন্ন দলের মধ্যে, রক্ষীবাহিনী কর্তৃক হত্যাকাণ্ডে, বিভিন্ন মাওবাদী ও বাম গোষ্ঠীর হত্যাকাণ্ডে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রদায়গত সংঘাতে। সাম্প্রদায়িকতার স্লোগান মূলত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইসলামের বিরুদ্ধে দেয়া হয়ে থাকে। তারা আসলে চান ইসলামী দলগুলো নিষিদ্ধ হোক— অফিসিয়াল অর্ডার দ্বারা বা সংবিধানের মাধ্যমেই ইসলামী দল নিষিদ্ধ করে। এটা অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক। এই সেকুলার শক্তিগুলো ইসলামী শক্তিগুলো কাজ করুক তা চান না, তাদের কাজ করতে দিতেও চান না। তারা ভয় পান, ইসলামী দলগুলো যদি কাজ করতে পারে তাহলে ক্ষমতায় না গেলেও তারা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা কোনো প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা পছন্দ করেন না। সেজন্য তারা তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকুক, তা চান না।

তারা ইসলামকে ব্যক্তিগত বিষয়াদির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিতে চান। তারা রাষ্ট্র থেকে ইসলাম দূরে থাকুক তাই চান। তারা আরও চান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকেও ইসলাম দূরে থাকুক। সেকুলারিজম প্রকৃতপক্ষে এটাই চায়। এর অর্থ, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মবর্জন। ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটা ভুল অনুবাদ। অবাক লাগে, ইসলাম বা ধর্ম রাষ্ট্রীয় আদর্শ হতে পারবে না, অথচ সেকুলারিজম (যা অধর্মের সমার্থক) রাষ্ট্রীয় আদর্শ হতে পারবে— এটি গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম যেখানে একটি ব্যাপক দ্বীন বা জীবনপদ্ধতি, সেখানে এই প্রত্যাশা কীভাবে সম্ভব? ইসলামের কোনো অংশ বিশ্বাস করা এবং কোনো অংশ বিশ্বাস না করাকে আল্লাহ কোরআনে কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন। তদুপরি ইসলাম, ইসলামী আইন এবং রাষ্ট্র সব সময় একত্রে ছিল। এগুলো একটি অন্যের সঙ্গে জড়িত। আমরা মুসলিম ইতিহাসেও এসবের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লক্ষ করি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে শুরু করে, খোলাফায়ে রাশেদিন, পরবর্তী খেলাফতের সময় কিংবা সুলতানি আমলেও আমরা তা দেখি, যদিও পরবর্তীকালে তার আদর্শরূপ ছিল না। বাংলাদেশের ও বিশ্বের অন্য মুসলমানদের জন্য ইসলামই তাদের মূল পরিচিতি। তাদের নাম, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, আদবকায়দা, তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনকানুন, পারিবারিক মূল্যবোধ, তাদের নৈতিকতা, এমনকি তাদের সার্বিক আচরণ— কোনো কিছুতেই ইসলামের চেয়ে বেশি প্রভাব অন্য কোনো কিছু ফেলতে পারেনি। আমরা সবাইকে আহ্বান করব, এসব হীন কাজ থেকে দূরে থাকতে। তাদের দূরে থাকা উচিত সাম্প্রদায়িকতা শব্দের অপব্যবহার থেকে। এটি এখন গালাগালির টার্ম হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।

শাহ আবদুল হান্নান 
লেখক : সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
(আমার দেশ, ০১/২/২০১৪)

Advertisements