কুমিল্লা রুরাল একাডেমির এককালীন ডিরেক্টর এবং প্রেসিডেন্ট সায়েমের উপদেষ্টা আজিজুল হক সাহেব ১৯৬৯ সালে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলতে পারেন পূর্ববাংলা যদি হঠাৎ স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে বাঙালিদের হাতে এই দেশের অবস্থা কী রকম হবে? আমি তার এই প্রশ্ন শুনে অবাক হয়েছিলাম, তবে মজাও পেয়েছিলাম। কিন্তু তার এই প্রশ্নের মধ্যে যে উদ্বেগ ছিল, বিপদের যে আশংকা ছিল, সেটা তখন বুঝেছিলাম বললে ঠিক হবে না। অবশ্য বাংলাদেশ সত্যি সত্যিই হঠাৎ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে যে অবস্থা তৈরি হল, স্বাধীন বাংলাদেশের যে চেহারা দাঁড়াল, জনগণের জীবনে যেভাবে দুর্দশার অন্ত থাকল না, সেটা দেখে আজিজুল হক সাহেবের প্রশ্নের মমার্থ যেমন উপলব্ধি করেছিলাম, তেমনি তার সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শ ও মতামতের অনেক পার্থক্য সত্ত্বেও এ দেশের সন্তান হিসেবে দেশের অবস্থার সঙ্গে তার পরিচয়ের গভীরতার কথা ভেবে তার প্রতি শ্রদ্ধা এসেছিল।

এ দেশের সাধারণ মানুষের পরিশ্রমের ক্ষমতা, সৃষ্টিশীলতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কথা বিবেচনা করে এটা ভাবা অস্বাভাবিক নয় যে, বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে এ দেশ পরিচালিত হলে ৪২ বছরে বাংলাদেশ উন্নতির দিক দিয়ে ইউরোপের যে কোনো দেশের থেকে পিছিয়ে থাকত না। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যখন বিপ্লব হয়েছিল, তখন সে দেশটি ছিল দীর্ঘদিন স্বৈরতান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর জারতন্ত্র শাসিত এক অতি পশ্চাৎপদ দেশ। স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির মাত্র ১৪ বছর পর রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় গিয়ে তার উন্নতির চেহারা দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। জাত বুর্জোয়া হলেও রবীন্দ্রনাথ সেই উন্নতির বিভিন্ন দিক নিয়ে সংস্কারমুক্ত হয়ে যে বর্ণনা দিয়েছিলেন সেটা চোখ খুলে দেয়ার মতো ব্যাপার। স্ট্যালিনের মৃত্যু হয়েছিল ১৯৫৩ সালের মার্চে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসকাণ্ডের পরও বিপ্লবের ৩৫ বছরের মাথায় তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন উন্নতির প্রত্যেকটি মানদণ্ডের বিচারে ইউরোপের যে কোনো উন্নত দেশকে অতিক্রম করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাক্রান্ত সাম্রাজ্যবাদী দেশের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিল! পরিণত হয়েছিল বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তিতে। এই অতি অসামান্য সাফল্য সত্ত্বেও বিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী প্রচারণার কারণে স্ট্যালিনের এবং সেই সঙ্গে লেনিনেরও পরিচয় শুধু মতলববাজ জনশত্র“দের মধ্যেই নয়, সাধারণ শিক্ষিত ও নিরীহ মানুষের মধ্যেও বিশ্বজুড়ে দাঁড়িয়েছে চরম নির্যাতক, খুনি ও ক্রিমিনাল হিসেবে!! এই প্রচারণার প্রবল শক্তি এবং তার প্রভাব সাধারণ বিশ্বাসপ্রবণ লোকদের মধ্যে এমনই, যাতে স্ট্যালিনের নাম করলে তার প্রতি গালাগালি বর্ষণ করতে তাদের কোনো দেরি হয় না, ডাবল চিন্তার প্রয়োজন হয় না। কারণ এ ‘ডাবল চিন্তা’ সাম্রাজ্যবাদীরা ও দেশে দেশে তাদের টাউট ট্যান্ডল ও মক্কেলরা তাদের জন্য তৈরি করে রেখেছে। তাদের এই ভাবনা-চিন্তা সাম্রাজ্যবাদের বিশাল ও পরাক্রমশালী প্রচারমাধ্যম বিবেক আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জনগণের মস্তিষ্ক ও বিবেক প্রকৃতপক্ষে এখন সাম্রাজ্যবাদী এই প্রচার মাধ্যমের কারখানায় বন্দি। কাজেই এ প্রশ্ন তাদের মনে আসে না যে, স্ট্যালিনের মৃত্যু লেনিন, স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির দ্রুত বুর্জোয়াকীকরণ ও শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পর দেশটির অবস্থা ১৯৯১ সালে এসে কোথায় দাঁড়িয়েছিল এবং এখন তার পরিণতি কি হয়েছে? রাশিয়ার জনগণ এখন আগের তুলনায় কেমন আছে? তারা সমাজতন্ত্র থেকে মুক্তির স্বাদ কীভাবে উপভোগ করছে? চীনের দৃষ্টান্ত এদিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ফিরে এসে এদিক দিয়ে যে চিত্র আমরা দেখি তা একেবারেই ভিন্ন। বাঙালিদের ৪২ বছরের স্বাধীন শাসন আমলে বাংলাদেশে লুণ্ঠনজীবীদের শাসনে উৎপাদন ও ধন-সম্পদ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু যাদের শ্রমশক্তি এই উন্নতির প্রধান কারণ তারা এর কোনো ভাগ প্রকৃতপক্ষে পায়নি। চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, প্রতারণা ও সরাসরি লুটপাটের মাধ্যমে তা শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের পকেটে পড়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণের চেতনায় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সুশিক্ষা, উন্নত সংস্কৃতি ও বিশ্রামের যে আকাক্সক্ষা ছিল তার সবকিছুকেই নস্যাৎ করে প্রথম থেকেই বাংলাদেশের নব্য শাসকশ্রেণী নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, এই শাসকশ্রেণী নিজেরা দেশের জনগণের ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সর্বনাশ করলেও এই পরিণতির জন্য নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক হিসেবে অহরহ আস্ফালন ও নিজেদের গৌরবান্বিত করার কাজে নিযুক্ত আছে। শুধু তাই নয়, যারা তাদের বিরোধিতা করে তাদের সবাইকেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী, এমনকি পাকিস্তানপন্থী বলতে লজ্জা অথবা কুণ্ঠাবোধ করে না! মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের আসন এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা ইত্যাদি যেভাবে তাকে ভূষিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা বিবিসি এক ভুয়া জরিপ চালিয়ে তাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে ঘোষণা করেছে! বিবিসি এ জরিপ কাজ পরিচালনার অধিকার কোথা থেকে পেল, এ প্রশ্ন বাংলাদেশী শাসকশ্রেণীর কোনো অংশ এবং তাদের বুদ্ধিজীবীরা করল না! এ জরিপ পশ্চিম বাংলায় না চালিয়ে শুধু বাংলাদেশে কেন চালানো হল এ নিয়েও কেউ প্রশ্ন করল না!! এর ফলে শুধু মুসলমান প্রধান বাংলাদেশের লোকরা ভোট দেয়াতে এই জরিপের সাম্প্রদায়িক চরিত্র যে এক কঠিন সত্য ব্যাপার এ নিয়ে কেউ কোনো সমালোচনাও করল না!! কাজেই রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের মাথায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির মুকুট পরানো হল!!! লক্ষ্য করার বিষয় যে, এভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা যাকে প্রতিষ্ঠিত ও গৌরবান্বিত করার চক্রান্তমূলক কাজটি করল তার শাসন আমলে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির কোনো পতাকা ওড়েনি। উপরন্তু জনগণ সেই শাসনের নির্যাতনে ও তার শোষণ-লুণ্ঠনের মধ্যে বসবাস করে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধূলিসাৎ হতে দেখলেন। শেখ মুজিব ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দেশ শাসনের যে ঐতিহ্য নিজেদেরই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছিলেন সে ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগ এবং সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগবিরোধীদের সরকারের আমলে রক্ষিত হয়ে আসছে। কারণ শেখ মুজিব চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে চরম অগণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তার প্রয়োজন শুধু আওয়ামী লীগের ছিল না। সমগ্র শাসক শ্রেণীর স্বার্থেই তিনি সেটা করেছিলেন। সামান্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝার অসুবিধা হবে না কেন তিনি বাংলাদেশের লুণ্ঠনজীবী শাসকশ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদীদের এত প্রিয়।

একেবারে এই মুহূর্তের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আমরা দেখছি যে, বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি ভুয়া নির্বাচনের পর তিন-চতুর্থাংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন এতই ভুয়া ছিল যে, কোনো নির্বাচন ছাড়াই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের মতো আসন শক্তি অর্জন করেছিল! এই দলের নির্বাচন প্রার্থী মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের অর্থ-সম্পদের যে হিসাব দাখিল করেছিলেন তার থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছিল কী বিশাল আকারে চুরি-দুর্নীতি করে তারা নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এই দুর্নীতিবাজদের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই! এদের কয়েকজনকে সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ দিলেও অন্যদের নতুন মন্ত্রিসভায় ও সংসদে রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে পুরনো বেশ কয়েকজনকে। এভাবে অলংকৃত হয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত’ নতুন সরকারের!! এদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার মতো কোনো শক্তি আপাতত বাংলাদেশে নেই। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপানসহ সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থন ও সাহায্যপুষ্ট হয়ে এদের ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থার রেলগাড়ি আগের মতোই অথবা তার থেকেও নিষ্ঠুরভাবে চলবে। লেনিন-স্ট্যালিনের মতো কোনো ‘জনশত্র“ নির্যাতক খুনি’র মতো নেতার পরিবর্তে শেখ মুজিবের মতো গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী নেতার পতাকা বহন করে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের প্রচার মাধ্যম এখন এই সম্ভাবনার ওপরই আলোকপাত করছে!

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
যুগান্তর, ০২/০২/২০১৪

Advertisements