গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যবর্গ একাধিকবার বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নিমিত্তে নির্বাচন। তবে এ বক্তব্যটি সম্প্রতি তারা আর উচ্চারণ করছেন না। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, সংবিধান বলছে পাঁচ বছর পরপর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নবম সংসদের মেয়াদ যেহেতু পাঁচ বছর প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল তাই একটি নির্বাচন করতেই হতো। অনেক বিজ্ঞজন এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনও এরই মধ্যে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, এ নির্বাচনটি কোন সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য করা হয়েছে? যে সংবিধান ২০১১ সালের জুনের আগে বহাল ছিল ১৪টি সংশোধনীসহ- সেটি? নাকি ২০১১ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে পার্লামেন্ট কর্তৃক পাসকৃত পঞ্চদশ সংশোধনী সংবলিত সংবিধান, সেটি? প্রচারণায় অতি দক্ষ ও পারঙ্গম একটি রাজনৈতিক দলের নাম আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন কর্মসূচি এবং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক বিলোপ বিষয়টির পক্ষে মাসের পর মাস জনসমক্ষে প্রচার করে গেছেন। সুতরাং ২০১৩ ডিসেম্বর বা ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে যে নির্বাচনটি আসবে সেটি সংবিধানের দোহাই দিয়ে অনুষ্ঠিত করতে হবে, সেই সঙ্গে সংবিধানকেও ওইভাবে প্রস্তুতও করা হয়, যাতে করে কোনো প্রশ্ন না থাকে। এ সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন আড়াই থেকে তিন বছর আগেই। কিন্তু বিরোধী শিবিরে এ বিষয়টি নিয়ে যে কর্মসূচি এবং রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করা হয়েছে, সে পরিকল্পনা কিন্তু আড়াই থেকে তিন বছর আগের করা নয়। বিরোধিতা করার পরিকল্পনাগুলো অতি সাম্প্রতিক। বিরোধী শিবির যে কর্মসূচি নিয়েছে তার মধ্যে ভালো-মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। যেহেতু বিরোধী শিবিরের আমিও একজন অংশীদার। তাই সার্বিক বিচারে বলতে চাই আমাদের কর্মকাণ্ডে সাফল্যও ছিল, ভুল-ত্র“টিও ছিল। যাই হোক, ১৯৯৬ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে তৎকালীন বিএনপি সরকার এবং পার্লামেন্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য সংবিধানে যে সংশোধনী এনেছিলেন, সেই সংশোধনীটি তৎকালীন সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের পরপরই যুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। সম্মানিত পাঠক পুরনো সংবিধান ঘাঁটলেই এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাংলাদেশের সংবিধানেই উল্লেখ ছিল, সংবিধানের কোনো কোনো ধারা সংশোধন করতে হলে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর মতামত লাগবে- শুধু পার্লামেন্টের মতামতের ভিত্তিতে চলবে না।

শেখ হাসিনার সরকার ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভ করে। অনেক সমালোচকই বলেছেন, তৎকালীন মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার এবং কিছু আন্তর্জাতিক মহল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল, সেখানে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু যা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল না সেটি হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার বিষয়টি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার এখতিয়ার বাংলাদেশের পার্লামেন্টের নেই, বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টেরও নেই। তাহলে সে অধিকার কার আছে বা কার ছিল? আমার মূল্যায়নে সেই অধিকার আছে বাংলাদেশের জনগণের। কারণ ১৯৯৪, ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির অনুকূলে যে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল সেটি জনগণের আন্দোলন বলে অভিহিত এবং যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে সন্নিবেশ করা হয়েছিল সেটি জনগণের দাবির প্রতি সম্মান জানানোর জন্যই। কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়। যে দাবিটি জনগণের দাবি ছিল সেটি পূরণ করেছিল একটি রাজনৈতিক দল। সেই জনগণের দাবির একটি অর্জনকে অন্য আরেকটি রাজনৈতিক দল বাতিল করতে পারে কি-না? সেটি একটি প্রশ্ন? আরেকটি প্রশ্ন হল, জনগণ তাহলে কোন নিয়মে জানাবে, তারা ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চায়- কি চায় না?

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ প্রসঙ্গে যে বিখ্যাত রায়টি দিয়েছেন, সেটির দুটি রূপ আছে। একটি হচ্ছে, মৌখিক সংক্ষিপ্ত ভাষ্য। অপরটি হচ্ছে, লিখিত এবং দীর্ঘ ভাষ্য। আজ থেকে দুই আড়াই মাস আগে অন্যতম টিভি চ্যানেল জি-টিভিতে অনুষ্ঠিত একটি টকশোতে ডেইলি স্টারের সম্মানিত সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ‘বিচারপতি জনাব এবিএম খায়রুল হক কর্তৃক প্রদত্ত রায়টি ছিল পলিটিক্যালি হাইলি ইরিসপনসিবল।’ দুটি রায়ের মধ্যে কিছুটা পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আছে। সে কথা মেনেই বলতে চাই, বিচারপতি খায়রুল হক সাহেব তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে রায় দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে এ বিষয়ে স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করতে পারে। আমার এ রায়ের মাধ্যমে সুপারিশ করছি, আরও দুবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির আওতায় নির্বাচন করা যেতে পারে। কিন্তু শর্ত একটি, প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার বিষয়টিকে বাদ দিতে হবে।’ এটি ছিল বাধ্যতামূলক নির্দেশ। যখন রায়টি প্রকাশ করা হচ্ছিল, ওই মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে বিধান ছিল, এ পদ্ধতি বাতিল করতে হলে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত করতে হবে। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক তার রায়ে একবারও বলেননি, গণভোটের বিষয়টিকে বাতিল করতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়গুলোর তোয়াক্কা না করে গত আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষকে অনেকবার বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, সুপ্রিমকোর্টের দেয়া রায়ের কারণেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে। আমার দৃষ্টিতে জণগণের সঙ্গে এটি একটি প্রতারণা।

অ্যাডভোকেট মোমিনুল হক নামের এক ব্যক্তি, তিনি বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজ্ঞ। পুরনো ঢাকার জজকোর্টেও প্র্যাকটিস করেন। তিনি ‘গণতন্ত্রের সংলাপ’ শিরোনামে একটি বই রচনা করেন। ওই বইয়ের ৫৭, ৫৮ ও ৫৯ এবং ৯১, ৯২ পৃষ্ঠায় তার দেয়া বক্তব্যের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কলামের স্থানাভাবে বক্তব্যগুলো উল্লেখ করলাম না। সম্মানিত পাঠক বইটি সংগ্রহ করে যদি ওই বক্তব্যগুলো পড়তে পারেন তাহলে বাংলাদেশের সংবিধান এবং জনগণের মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য একটি সম্পর্ক ছিল, সেই সম্পর্কটিকে কী নিয়মে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রহিত করা হয়েছে সেটি স্পষ্ট হয়ে যাবে। সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, এটি সংবিধানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে। তবে মুসলমান হিসেবে বলতে চাই, মহান সৃষ্টিকর্তাই সব ক্ষমতার উৎস। পার্থিব সব ক্ষমতার উৎস জনগণ, এভাবে লেখা থাকলে খুশি হতাম। যাই হোক, আমাদের সংবিধান মতে যেহেতু জনগণ সব ক্ষমতার উৎস, সেহেতু সেই ক্ষমতার প্রতি কতটুকু সুবিচার করা হয়েছে বা হচ্ছে, তাছাড়া সেই ক্ষমতা প্রকাশের মাধ্যম কি শুধু পাঁচ বছর পরপর একবার নির্বাচন? নাকি আর অন্য কোনো মাধ্যম রয়েছে? নিশ্চয়ই অন্য কোনো মাধ্যম রয়েছে, যেমন- যে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য জনগণের মত দেয়ার বিষয়টি। কিন্তু বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার সেটি বাতিল করে দিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান পৃথিবীতে একটি ব্যতিক্রমী সংবিধান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

দুই.
বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে একটি অস্থির অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশে তরুণ কারা, এটা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। দেশের সংবিধানে কিছু বিদঘুটে আইন রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল, শিশুর সংজ্ঞা নিয়ে আইন। ১৮ বছর থেকে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারি। সুতরাং ভোটাধিকার প্রয়োগের আগের দিন পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু কিশোর নিয়ে সঠিক সংজ্ঞা আইনের আওতায় আনা হয়নি। ইসলামের ভাষ্যমতে, ১২ বছরের নিচে হল নাবালক। ১২ বছর পার হলে ওই ব্যক্তির ওপর ধর্মীয় হুকুম ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, সবগুলো না হলেও। তাহলে ১৭ বছরের কোনো ব্যক্তিকে কি আমরা শিশু বলব? ৪০-৫০ বছর আগেও বাংলাদেশে ১৭ বছরের কোনো বালক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতেন এবং ১৮ বছরের আগেই তিনি পিতা হতেন। কথাটি কেন বললাম? বললাম এ জন্য, পৃথিবীর অন্য দেশের তরুণরা যেমন সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের তরুণরা সেই সুবিধা পাচ্ছে না। পাচ্ছে না কথাটি আপেক্ষিক। কিছুটা পাচ্ছে, যতটুকু পাওয়া উচিত ততটুকু পাচ্ছে না। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, লেখক হতে মানুষ একদিনের চেষ্টা বা অধ্যবসায়ে সফল হতে পারে না। সময় লাগে। কিন্তু তার শুরুটা হয় তরুণ বয়সে। আমি নিজেকে যদি বাংলাদেশের একজন সফল মেজর জেনারেল বলি, তাহলে আমাকে বলতেই হবে আমার শুরুটা হয়েছিল ২১ বছর বয়সে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট র‌্যাংকে। সফল ব্যবসায়ী আনিসুল হক, ব্যবসায়ী নেতা আকরাম তাদের সবারই শুরুটা হয়েছিল তরুণ বয়সে। সুতরাং এখন থেকে ২০ বছর পর যেসব তরুণ নেতা হবেন, তাদের আজকে থেকেই শুরু করতে হবে। শুধু তাই নয়, তাদের সামনে একটি লক্ষ্য থাকতে হবে। সেই লক্ষ্যেই তারা এগিয়ে যাবেন। এ বিষয়টি আমাদের দেশে সার্বিক চিন্তা-চেতনায় খুবই গৌণ। সুতরাং একে মুখ্য ভূমিকায় আনা উচিত। দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই আমাদের সেটা করা উচিত।
আমরা রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাই এবং রাজনৈতিক গালাগাল খুব বেশি করি। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের অনেক বেশি বিতর্কিত করি। কিন্তু শুধু রাজনীতি একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে না। রাজনীতিবিদরা দিকনির্দেশনা দেবেন। সেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সব পেশার সম্মিলিত শক্তি এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়। তরুণরা সব পেশাতেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এই তরুণরা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক মহল থেকে দিকনির্দেশনা কামনা করছেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টির প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না, বিশেষ করে গত আড়াই বছর। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তরুণরা যেন টিকে যেতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

তিন.
সংবিধান, রাজনীতি, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এ সবকিছুর পেছনেই আদর্শিক চেতনা কাজ করে। যে জাতি বা সমাজ আদর্শিক চেতনার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে যায়, সেই জাতি বা সমাজের অগ্রগতি অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশের ধর্মীয় চেতনা মানুষের সার্বিক আদর্শকে বলীয়ান করে। এ দেশে সব ধর্মের অনুসারীরা আছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সব ধর্মাবলম্বী নিজ নিজকে ধর্মের মূলমন্ত্র বা চেতনাগুলোকে নিজ নিজ অন্তরে ধারণ করে নিজ আচরণে তা প্রকাশ করা উচিত। দলমত নির্বিশেষে পরমতসহিষ্ণুতার মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে জাতিকে ভাগ করা চলবে না। সব ধর্মেই মানবকল্যাণ নিহিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের আদর্শিক চেতনা হতে হবে পরমতসহিষ্ণুতা। দ্বিতীয় আদর্শিক চেতনা হতে হবে দেশ ও জাতির কল্যাণ। সেটি কোনো অবস্থায়ই ব্যক্তিগত পর্যায়ের না হয়ে সমষ্টিগত হতে হবে।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক : কলাম লেখক, চেয়ারম্যান বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
(যুগান্তর, ০১/০২/২০১৪)

Advertisements