বাংলাদেশের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে (আর্টিকেল ৬৫ এর ২ ধারা) বলা আছে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের বাইরে দেশে কোনো নির্বাচন সংবিধানসম্মত হবে না। যেহেতু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ১৫৪ প্রার্থী অর্থাত শতকরা ৫২ ভাগ প্রার্থী জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে গেছেন, তাই এ নির্বাচন সম্পূর্ণ সংবিধান পরিপন্থী। যারা এ নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত তাদের সবাই সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হবেন। এ কথাগুলো বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন মালিক।

রেডিও তেহরানের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, নির্বাচনের নামে বর্তমান সরকার জনগণের চেয়ে তাদের কৌশলকে বড় করে দেখছে। ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সরকারের জন্য ভালো হবে না। সরকার এ নির্বাচনের মাধ্যমে দুটো বড় সংকটে পড়বে।

পুরো সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হল:

রেডিও তেহরান: বিরোধী ১৮ দলীয় জোটকে নির্বাচনে আনার জন্য শেষ মুহূর্তেও তৎপরতা চালাচ্ছেন মার্কিন এবং বৃটিশ কূটনীতিকরা৷ তারা চাইছেন, নির্বাচন পিছিয়ে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে৷ এ জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে বৈঠকও করছেন তারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে একাদশ নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আপনার কি মনে হয়…নির্বাচন কি হচ্ছে নাকি কূটনীতিকদের উদ্যোগে আপাতত স্থগিত হয়ে নতুন করে নির্বাচন হবে?

ড.তুহিন মালিক: জ্বি, কূটনীতিকরা চাইবে এ নির্বাচন স্থগিত করতে। আর এটি খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কারণ দেশের মানুষ চচ্ছে না এ ধরনের একটি নির্বাচন হোক। কিন্তু সরকারের স্ট্রাটিজির বিষয়টি থেকে ফুটে উঠছে যে তাদের নির্বাচন না করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে মনে করছে যেদিন তারা নির্বাচন থেকে সরে আসবে সেদিন তাদের রাজনৈতিক পতন হবে। এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। ফলে সরকারি দল  রাষ্ট্রের জনগণের প্রয়োজনের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে বড় করে দেখছে। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলের এই স্বার্থকে যেহেতু সরকারি দল বড় করে দেখছে সেহেতু তারা ৫ তারিখের নির্বাচন বাতিল করবে না।

তাছাড়া সরকারের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে না তারা নির্বাচন থেকে সরে আসবে। তারা বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মহাজোটের বড় শরীক দল জাতীয় পার্টির এরশাদকে যেভাবে আটক করে রেখেছে এবং তৃতীয় বড় দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে যেভাবে নিষিদ্ধ করে রেখেছে তার মানে দাঁড়াচ্ছে সমস্ত বিরোধী দল সরকারের খড়গের মধ্যে রয়েছে। তাদের ওপর প্রচণ্ড জুলুম ও নির্যাতন চলছে। সেখানে সরকার তাদের হার্ডলাইন থেকে বেরিয়ে আসবে এমনটি মনে হচ্ছে না। বরং সরকারের একজন মন্ত্রী বললেন ৫ তারিখের নির্বাচনের পর সরকারের মূল দায়িত্ব হবে বিরোধীদলকে সমূলে নির্মূল করা। তাছাড়া তথ্যমন্ত্রী বললেন ৫ তারিখ নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হবে তার প্রধান কাজ। ফলে সরকার যেভাবে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সেখানে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না জনগণের আকাঙ্খা এবং গণতন্ত্রের ভাষা তারা বুঝতে পারছে না।

আর এ বিষয়ে আমি আরো কিছু কথা বলতে চাই। সাধারণ শ্রোতাদের একটা বিষয় বোঝা খুব দরকার। আর সেটি হচ্ছে- কয়েকদিন আগে ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে  বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি একটি সভা করেছিলেন। আর সেই বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল- আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যদি স্থগিত বা বাতিল করা  না হয় তাহলে দেশে সাংঘাতিক রকম সংঘাত এবং  বিপর্যয় দেখা দেবে। আর এ সভার আয়োজক ছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন এবং আইন ও শালিস কেন্দ্র।ঐ সভায় সুশীল সমাজের যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা কিন্তু স্পষ্টভাবে বুঝেছেন যে, আগামী ৫ তারিখের নির্বাচন হবে একটি তামাশার নির্বাচন। নির্বাচন যদি হয়ও তারপরও তা আন্তর্জাতিক বিশ্বে বৈধতা পাবে না। মার্কিন সিনেটে  বাংলাদেশের এই নির্বাচন বন্ধের জন্য একটি রেজুলেশন জারি করা হয়েছে- যার নাম্বার হচ্ছে-৩১৮ । তাছাড়া আপনারা নিশ্চয়ই একথা জানেন যে একমাত্র ভারত ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পশ্চিমারাসহ গোটা বিশ্ব আগামী ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আর আমাদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বিশ্বজনমতের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না সে নির্বাচন কোনোভাবেই বৈধতার প্রশ্ন ওঠে না। আমি আবারও বলছি আপনারা যেভাবেই ধরেন না কেন – নির্বাচন যদি করেও ফেলা হয় সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তো কোনোভাবেই বৈধ হবে না একইসাথে দেশের ভেতরেও তার বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এরফলে সরকারি দলের জন্য দুই ধরনের বড় সমস্যায় পড়তে হবে।

প্রথমত, যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইবুনালে বিচার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হবে। কারণ অবৈধ সরকারের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কোনো বিচার প্রক্রিয়া করাটা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

দ্বিতীয় সমস্যাটি আসবে সামনের বাজেটের সময়। কারণ বাজেট প্রস্তুতের সময় আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী এবং সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সবরকমের সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে। নবম সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার আগামী ২৪  জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধভাবে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করে যখন তারা নতুন করে ক্ষমতায় আসবে তখন তারা বৈধতা হারাবে। আর একটা অবৈধ সরকারের পক্ষে দেশের ভেতরে এবং বাইরে টিকে থাকাটা অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

রেডিও তেহরান:  ৫ জানুযারি যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে তা কি আসলে এ সময় আর স্থগিত করা বা পেছানোর সুযোগ আছে কিনা? এরইমধ্যে কিন্তু ১৫৪টি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। নির্বাচন স্থগিতের ক্ষেত্রে এটা কোনো বাধা হবে কি?

ড.তুহিন মালিক: আমি বলব নির্বাচন স্থগিতের সুস্পষ্ট সুযোগ রয়েছে। সংবিধানেও এ ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধানের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্র বিরোধী। আপনারা জানেন যে বর্তমান সরকার বারবারই সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। বর্তমানে যে একতরফা নির্বাচন সেটিও সংবিধানের দোহাই দিয়েই তারা করছে। তাছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে একই সংবিধানের দোহাই দিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকার যা কিছুই করেছে এবং করছে তার সবক্ষেত্রে  সংবিধানের দোহাই দিয়েছে।

তবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে (আর্টিকেল ৬৫ এর ২) এ বলা আছে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের বাইরে দেশে কোনো নির্বাচন সংবিধান সম্মত হবে না। তাছাড়া আমাদের সংবিধানের মূল স্পিরিট সম্পর্কে আর্টিকেল ১১ এ বলা হয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমেই রাষ্ট্রশাসিত হবে। কিন্তু আপনারা তো দেখছেন যে ১৫৪ টি আসনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাছাড়া আমাদের আরপিওর ক্লজ ২৬ এ স্পষ্টভাবে বলা আছে- ভোট কাস্টিং হওয়ার পর রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ভোট গণনা হবে। তারপর যিনি বেশি ভোট পাবেন তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। এরপর রেকর্ডটা রিটার্নি অফিসার সংরক্ষণ করবেন। কিন্তু এই ১৫৪ জনের ক্ষেত্রে ভোট দেওয়াও হয়নি, ভোট কাউন্টও হয়নি এবং সংরক্ষণের তো প্রশ্নই ওঠে না। ১৫৪ জন তো জনগণের প্রতিনিধি নন,জনগণ তাদেরকে ভোট দেয়নি। অতএব আমাদের সংবিধান স্পস্টভাবে বলা আছে,  জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট ছাড়া কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তো কোনোভাবেই সাংবিধানিক নয়। এবং এটা পেছানোর এখনও সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি। আমাদের সংবিধানের (১২৩ এর ৩ এর খ) তে বলা আছে যে সংসদ যদি আজকে ভেঙে দেয়া হয় তাহলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আপনি নির্বাচন করতে পারবেন। আর সেই হিসাবে আগামী ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময় আছে। এরমধ্যে আলাপ-আলোচনা, সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা করে নির্বাচন করা যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের নির্বাচন কমিশনকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।’ ১১৯ অনুচ্ছেদে’ বলা হয়েছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে  নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্বের অতিরিক্ত যে কোন কার্যাবলী গ্রহণ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে যদি সমঝোতার কোনো সুযোগ হয়েই থাকে তো সরকার নির্বাচন পেছাতে পারে এবং সংবিধানে সেকথাই বলা আছে। ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করাটাই সংবিধান সম্মত।

রেডিও তেহরান: প্রসঙ্গক্রমে বলব—৫ জানুয়ারি যদি নির্বাচন হয় তাহলে যে সরকার  গঠিত হবে তার সঙ্গে চূড়ান্ত অসহযোগিতার পথে হাঁটবে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ রকম একটি খবর দিয়েছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা। প্রশ্ন হচ্ছে- আমেরিকা-ইউরোপ অসহযোগিতার পথে হাঁটলে তাতে কিই বা ক্ষতি হতে পারে… যেখানে ভারত আমাদের পাশে থাকবে?

ড. তুহিন মালিক: দেখুন এখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির বিষয় রয়েছে। তো যদি আমি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা বাদও দেই কেবল অর্থনীতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে  বিবেচনা করি তাহলেও বিষয়টি ঠিক নয়। কারণ ডিমের উদাহরণের মাধ্যমে  বিষয়টি স্পষ্ট করা যাবে। একজন যদি তার একটি ঝুড়িতে সবগুলো ডিম রাখে তাহলে একটা রিস্ক ফ্যাক্টর থেকে যায়। আর যদি ডিমগুলোকে বিভিন্ন ঝুড়িতে রাখা হয় তাহলে ঝুঁকিটা কমে যায়। ঠিক একইরকমে একটি দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতি  যদি সম্পূর্ণ ভারত কিম্বা যে কোনো একটি দেশের ওপর  নির্ভরশীল হয়ে যায় তাহলে কূটনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। এজন্য বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক সহযোগিতার সাথে সাথে বিশ্ব সহযোগিতার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের রপ্তানীর বড় বাজার হচ্ছে আমেরিকা এবং  ইউরোপ। শুধু তাই না ‘ডব্লিউটিও’ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা এ ধরনের সবকিছুতে আমরা কিন্তু পৃথিবী থেকে বিচ্ছ্ন্নি না। আর যদি আমরা পৃথিবীর এই এ্যাভিনিউ গুলোকে বন্ধ করে কেবলমাত্র আঞ্চলিক ক্ষুদ্র একটা গলির মধ্যে প্রবেশ করতে চাই তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা শুধু আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছ্ন্নিই হয়ে যাবো না বড় ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বাংলাদেশ।

রেডিও তেহরান: ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হলে তা দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলে বিভিন্ন মহল থেকে বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন জোট নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অনেকটা অ্যাডামেন্ট। এর কারণ কি?

ড.তুহিন মালিক: এ ব্যাপারে আপনাকে একটু পেছনের দিকে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসটাকে দেখতে হবে। সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় একটা সংকট তৈরী হয়। কোনো সরকারই ক্ষমতা সুষ্ঠুভাবে হস্তান্তর করতে চায় না। এ ব্যাপারে আমি বলব, ক্ষমতায় প্রবেশ করাটা এখন যেরকম বড় ধরনের  ঝুকিঁপূর্ণ বিষয় ক্ষমতা ছাড়াটা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আমরা খুব নিকট অতীতে দেখেছি ক্ষমতা থেকে প্রস্থানের পর সেই দলীয় প্রধানের পরিবারের সদস্যদের কি রকম নির্যাতনের শিকার হতে হয়! আর যিনি ক্ষমতায় আসেন তিনি যুদ্ধ বিজয়ের মতো যেন পুরো দেশটাকে জয় করে নেন। আর যিনি হারেন তাকে সবকিছু জলাঞ্জলী দিতে হয়। জেল-জুলুম থেকে শুরু করে নানারকম নির্যাতন তাকে ভোগ করতে হয়। আর সেজন্য বড় দলগুলো ক্ষমতা হারিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে চাচ্ছে না। আর একটি বিষয় হচ্ছে- বর্তমান সরকারের উচ্চ মহলের সাথে সুবিধাভোগীরা যেভাবে লুটপাট দুর্নীতি করেছে তারা ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি চাচ্ছে না। কারণ ক্ষমতা চলে গেলে তাদের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি চলে আসবে। আর এই ঝুঁকিটা তারা দলীয় প্রধানের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তাকে বোঝানোর চেস্টা করছে যে কোনোভাবে টিকে থাকলেই আমাদের মঙ্গল হবে। তবে টিকে না থাকলে তাদেরই বড় বিপদ হবে। আর সেই বিপদটা তারা দলীয় প্রধানের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে। আর দলীয় প্রধানের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক না থাকার কারণে একই সাথে বিশেষ কোনো দেশ বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতার কারণে তিনি আশ্বস্ত বোধ করেন। জনগণের প্রতি তার কোনো আশ্বস্ততা থাকে না। রঙ্গীন চশমা পরে সবকিছু দেখেন। ফলে তার কাছে সবকিছু তখন রঙ্গীন মনে হয়। কিন্তু যখন সানগ্লাস খোলেন তখন সাদা কালো আলোতে তার জন্য খুব বিপদজনক একটা চিত্র ভেসে ওঠে। তখন তারা বুঝতে পারেন আসলে জনগণ তাদেরকে কি চোখে দেখছে! শুধু তাই নয় এর পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে সেটাও তখন তারা বুঝতে পারেন। ফলে দেশের ভেতরে এবং বাইরে যারা বর্তমান সরকার থেকে সুবিধাভোগী তারা কখনই সরকারকে সঠিক পথ দেখাচ্ছে না। সরকার সঠিক যেতে চাইলেও তাকে বাধা দেয়া হচ্ছে।

রেডিও তেহরান:  বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এরইমধ্যে তারা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ডেকেছে। কিন্তু, এই আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে আওয়ামী লীগ নির্বাচন স্থগিত করবে বলে মনে হয় না। তাহলে পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন আপনি?

ড.তুহিন মালিক: দেখুন সার্বিক বিচারে দেশের জনগণ বর্তমান সরকারের ৫ বছরের শাসনামলে যে কষ্ট ভোগ করেছে সেই কষ্ট লাঘব হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। আন্দোলন হোক কিম্বা নির্বাচন হোক যেটাই হোক না কেন জনগণের দুর্ভোগ কিন্তু বাড়ছে। আর জনগণের এই দুর্ভোগ কমানোর প্রচেষ্টা না আছে সরকারি দলের না আছে বিরোধী দলের। জনগণকে ভুগতে হচ্ছে এবং আরো ভুগতে হবে এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশের মতো একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটানোটা খুবই অসম্ভব একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ হচ্ছে রাষ্ট্র এখানে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে গেছে আর পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউশন এবং জনগণের ‘উইল’ অত্যন্ত ছোট হয়ে গেছে। কারণ দেশের পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউশনটাকে যেভাবে  সুস্থ – সবলভাবে শক্তিশালীভাবে দাঁড় করানোর কথা ছিল সেটা হয়নি। উপরন্তু দুটো দলই সেটাকে দূর্বল করে দিয়েছে। তাছাড়া জনগণের বিরুদ্ধে র‍্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী তৈরী করা হয়েছে। অন্যদিকে জনগণের পক্ষে যাদের দাঁড়ানোর কথা যেমন ধরুন দুদক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জুডিসিয়ারি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিম্বা নির্বাচন কমিশন তারা সেটা করিনি। এসব প্রতিষ্ঠান কিন্তু সরকারের তল্পীবাহক এবং সরকারের ক্যাডার বাহিনী হিসাবে কাজ করছে। আজকে ‘ইসি’ ইসি লীগ, ‘বিজিবি’ –বিজিবি লীগ এবং ‘পুলিশি ‘– পুলিশ লীগ হিসাবে কাজ করছে। সেখানে একটি ইনস্টিটিউশন হিসেবে পলিটিক্যাল পার্টি আন্দোলন করে কোনো সুফল আনতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। একই সাথে আমি বলব দেশের জনগণ যেখানে বড় দুটি দলের কাছে বারবার নিস্পেষিত হয়েছে সেখানে জনগণ আর রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আর সেকারণেই জনগণের আন্দোলন হচ্ছে না। #রেডিও তেহরান

Advertisements