একাত্তরের মানবতাবিরোধী আপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল আবেদনে তৃতীয় দিনের মতো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।

আটটি অভিযোগের মধ্যে ছয় এবং সাত নম্বর অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি পেশ করেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপির বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ করেন।

এসএম শাহজাহান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আট নম্বর সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারের একটি মামলায় সাজা হয় এবং পরে খালাস পান। সেলিম খানের বাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা তিনি খালের ও-পাড় থেকে দেখার কথা ট্রাইব্যুনালে বললেও তদন্ত কর্মকর্তাকে তিনি তা বলেননি।

তাছাড়া তিনি আরো বলেছেন, সাঈদী সেলিম খানের বাড়ি দেখিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় বলেছেন একথাও তাকে মোস্তফা হাওলাদার বলেননি। তাছাড়া ১৫/১৬ বছর আগে সাঈদী নাম ধারণের কথাও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি বলে জেরায় স্বীকার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

রাষ্ট্রপক্ষের ১২নম্বর সাক্ষী একেএম আউয়াল জবানবন্দিতে বলেছেন, শুনেছি দানেশ মোল্লা ও সেকেন্দার শিকদারের সাথে সাঈদী সাহেবও ছিলেন। জেরায় তাকে প্রশ্ন করা হয়- সাঈদী সাহেব থাকার যে কথা আপনি শুনেছেন তা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেননি কেন? তিনি বলেন, বলেছি। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় জানান, ‘শুনেছি সাঈদী সাহেবও ছিলেন- একথা এমপি আউয়াল তার কাছে বলেননি।’

এসএম শাহজাহান বলেন, সাত নম্বর অভিযোগ প্রমাণের পক্ষে ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের তিনজন সাক্ষীর ওপরও নির্ভর করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে তিন নম্বর সাক্ষী সাত নম্বর অভিযোগ বিষয়ে কিছুই বলেননি। ট্রাইব্যুনাল রায়ে ভুলক্রমে এটি করে থাকতে পারে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের, ১৫ নম্বর সাক্ষী সাত নম্বর অভিযোগ বিষয়ে বলেছেন- ঘটনার সময় সেলিম খান এবং তার বাবা নুরুল ইসলাম খান কেউ বাড়িতে ছিলেন না। ৭ মে’র আগেই সেলিম খান মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। কাজেই নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয়।

এসএম শাহাজাহান বলেন, এছাড়া সাত নং চার্জে আগুন দেয়া এবং নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের কোনো সাক্ষী নির্যাতন বিষয়ে কিছু বলেননি।

তিনি বলেন, এ ঘটনা বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সেলিম খানকে ২০১২ সালের ১০ জানুয়ারি ‘সেফ হাউজে’ এনে রাখে। ১১ এবং ১২ জানুয়ারি তাকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে আনে কিন্তু সে রাজি না হওয়ায় ১২ জানুয়ারি তাকে গাড়িতে করে আজিমপুরে তার মেয়ের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়।

দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পড়ে শোনানোর সময় আদালত জানতে চান- এর ভিত্তি কী? জবাবে আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের ‘সেফ হাউজ’ ডায়েরিতে এ তথ্য রয়েছে।

এরপর তিনি আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। আট নম্বর অভিযোগ ছিল মানিক পসারীর বাড়িতে আগুন দেয়ার পর সেখান থেকে ইব্রাহিম কুট্টি ও মফিজ উদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়া। এরপর ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা করা হয় এবং মফিজ উদ্দিন নির্যাতনের পর পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে মোট নয় জন- ২, ৪, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, এবং ১২ নম্বর সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এসএম শাহজাহান বলেন, চার্জে উল্লেখ আছে মানিক পসারীর বাড়ি আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে ৩টায়। কিন্তু ২ নম্বর সাক্ষী রুহুল আমিন নবিন বলেছেন তিনি ১১/১২টার দিকে জানতে পেরেছেন আগুন দেয়ার ঘটনা।

আসলে তিনি আগুন দেয়ার সময় ঘটনাস্থলে বা তার আশপাশেও ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী বলেছেন, ৭ মে’র অনেক আগেই রুহুল আমিন নবিন এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এরপর দেশ স্বাধীনের পর ১৮ ডিসেম্বর পাড়েরহাট তিনি তাকে প্রথম দেখেন।

আইনজীবী বলেন, রুহুল আমিন নবিন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নবম সাক্ষী তাকে আগে থেকেই চিনতেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন ২৫ মার্চের পর তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়াই স্বাভাবিক এবং রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী সে দাবিই করেছেন। কাজেই রুহুল আমিন নবিন আসলে ৭ মে’র ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না।

এরপর আট নম্বর অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের চার নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বলেন, এ সাক্ষীর পরিচয় কী? জেরায় তিনি স্বীকার করেছেন- কলা চুরির মামলায় জজ কোর্টে তার সাজা হয়েছে এবং এ মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ট্রলার চুরির দুটি মামলা বরিশাল কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।

এ পর্যন্ত যুক্তি পেশের পর শুনানি আগামী রবিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

যুক্তি উপস্থাপনের সময় রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, আসামিপক্ষে গিয়াসউদ্দিন মিঠু, ব্যারিস্টার তানভির আহমেদ আল আমিন, তারিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

http://www.rtnn.net//newsdetail/detail/1/1/77370#.Uuqla_mSySo

Advertisements