gulen-movementসমাজ ও বিশ্বের অনেক কিছুই ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন-জগৎ সম্পর্কীয় মৌলিক বিশ্বাসের পরিবর্তন না ঘটলেও মৌলিক বিশ্বাস কেন্দ্রিক কার্যসমূহের ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে পরিপালনের প্রক্রিয়াটি বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজে বিবর্তনশীল। আর তাই ইসলামকেন্দ্রিক বিষয়সমূহের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমরা অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করি। বিগত চার দশকে তুরস্কে ইসলামপন্থী আন্দোলনের কার্যাবলী প্রখ্যাত দার্শনিক, আলেম, শিক্ষক, চিন্তাবিদ, সমাজ সংস্কারক ফেতুল্লাহ গুলেন এর হাতে অভিনব রূপ ও কৌশল পরিগ্রহ করেছে। ফেতুল্লাহ গুলেন ও তাঁর সহকর্মীদের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গী ও কার্যকৌশল বিশ্ববাসীর কাছে ‘গুলেন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। তুরস্কে ইসলামপন্থী একে পার্টির ক্ষমতায়ন এবং দীর্ঘ ১০ বছরব্যাপী চরম সমাজতান্ত্রিক ও নাস্তিক্যবাদী সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করে এরদোগান ও আব্দুল্লাহ গুলের সরকার পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছে এই গুলেন মুভমেন্টের ব্যাপক অবদান। এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্বব্যাপী গুলেন ও গুলেন মুভমেন্টকে নিয়ে শুরু হয়েছে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। গুলেন ও গুলেন মুভমেন্টকে দেশপ্রেমিক জনতা, বিশেষকরে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের কাছে প্রাথমিকভাবে পরিচিত করানোর অংশ হিসেবে আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। এ বিষয়ে নিউজ ইভেন্ট ২৪ ডটকমে লিখেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক আবু সুলাইমান। ৫টি কিস্তিতে প্রকাশিত হবে লেখাটি। আজ প্রকাশিত হলো লেখাটির প্রথম কিস্তি। এ বিষয়ে আপনাদের মন্তব্য, আলোচনা-সমালোচনা একান্ত কাম্য।

ফেতুল্লাহ গুলেন

fethullah gulen

ফেতুল্লাহ গুলেন বর্তমান তুরস্কে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। ১৯৪১ সালে পূর্ব তুরস্কের আরজুরাম-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাল্যকাল কাটে ট্রাডিশনাল সুফি পরিবেশে। বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিতদের নিকট শিক্ষালাভ করেন তিনি। প্রথমে ধর্মবিজ্ঞানে পড়াশুনা। পরবর্তী সময়ে আধুনিক সামাজিক ও ভৌত বিজ্ঞানের বিষয়ও পড়াশুনা করেন। শিক্ষার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহই গুলেনকে তার সমকক্ষদের  ছাড়িয়ে যেতে সহযোগিতা করে। ১৯৫৮ সালে পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। এর পুরস্কারস্বরূপ তাকে ধর্মপ্রচারকের সরকারি লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এবং ইজমির শহরে ধর্ম-প্রচারের জন্য পদায়ন করা হয়। ইজমির তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম প্রদেশ। ইজমিরেই গুলেন তার কনসেপ্ট বিল্ডআপ -এর কাজ শুরু করেন। তাঁর শ্রোতার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকেন। তাঁর বক্তব্য ও বাক্যে তিনি তৎকালীন সময়ের আবশ্যকীয় সামাজিক সমস্যার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল তরুণ সমাজকে আহ্বান জানানো। যাতে তারা মানবতাবাদ, মানবাধিকার ও জ্ঞান ভিত্তিক আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকায়নের কাজ করে।

গুলেন শুধু শহরের মধ্যেই তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ রাখলেন না। তিনি পুরো আনাতোলিয়া প্রদেশ জুড়ে ভ্রমণ করলেন এবং শুধু মসজিদেই নয় বরং শহরের বিভিন্ন অডিটোরিয়াম, কনফারেন্স হল এবং ক্যাফে কর্নার, চা-কর্নার প্রভৃতি জায়গাতেও বক্তব্য রাখলেন। তাঁর এই সর্বত্র গমন তাকে সমাজের সকল প্রতিনিধিদের নিকট পৌঁছানোর সুযোগ এনে দেয়। দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিগত কারণে তিনি বিশেষভাবে, ছাত্র সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেন। তাঁর বক্তব্যের বিষয় আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক; সব সময় ছিল বৈচিত্র্যময়। কখনো তা শুধুমাত্র রাইচুয়ালিস্টিক ধমের্র মাঝে সীমিত ছিল না। তিনি বক্তব্য দিতেন- শিক্ষা, বিজ্ঞান, ডারউইনবাদ, অর্থনীতি ও সামাজিক সুবিচারের উপর। বিভিন্ন বিষয়ে তার চিন্তার গভীরতা ও মান বিভিন্ন স্তরের লোকজনদের মনে গভীরাকারে রেখাপাত  করে। তিনি সবার মনোযোগ আকর্ষণ ও সম্মান অর্জন করেন। গুলেন তাঁর আনুষ্ঠানিক ধর্ম প্রচারের কাজ হতে ১৯৮১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সরকারি ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি তিনি ১৯৬০ সাল হতেই শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে কাজ শুরু করেন। শিক্ষা সংস্কার নিয়ে তার ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা তাকে তুরস্কে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। ১৯৯৯ সালে তিনি তুরস্ক সামরিক সরকারের মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে দেশত্যাগ করে আমেরিকা গমন করেন। সেই সময় থেকে অদ্যাবধি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভ্যানিয়ায় অবস্থান করছেন।

গুলেন মুভমেন্টের ঐতিহাসিক পটভূমি গুলেন মুভমেন্ট হচ্ছে একটি সামাজিক আন্দোলন (Civil society movement)। তুরস্কের ইজমির নগরীর প্রচারক ফেতুল্লাহ গুলেন এবং তার একদল ত্যাগী, নিষ্ঠাবান ছাত্র, শিক্ষক, গার্জিয়ান এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি সামাজিক সেবা প্রদানকারী গ্রুপ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই গুলেন মুভমেন্টের। পশ্চিমা স্কলারদের নিকট, এটি গুলেন আন্দোলন (গুলেন মুভমেন্ট) হিসেবে পরিচিত। গুলেন মুভমেন্টের স্বেচ্ছাসেবীদের নিকট এটি হিজমেত বা ‘স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত। গুলেন এই আন্দোলনকে ‘মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ একদল লোকের আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। মুসলিম-বিশ্বাসভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে এটি ১৯৬০ সালের দিকে যাত্রা শুরু করে। আর এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ছাত্র-বৃত্তি, ছাত্রাবাস, স্কুল-কলেজ এবং কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষা-সেবা নিয়ে। বিগত চার দশকের মধ্যে এটি জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে এটি শিক্ষাক্ষেত্র হতে আন্তঃসাংস্কৃতিক, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। বর্তমানে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কয়েক মিলিয়নে। গুলেন মুভমেন্টের অনুসারীদের রয়েছে শত শত ফাউন্ডেশন, কোম্পানি, পেশাজীবী সংগঠন এবং অসংখ্য আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সামাজিক সংগঠন ও সংস্থা। প্রথম দিকে গুলেন মুভমেন্টের কাজ শুরু হয় মূলত ছাত্র-শিক্ষক, স্থানীয় অধিবাসী এবং বিভিন্ন সভা-সমিতি, সেমিনার ও ক্যাফে-কর্নারে গুলেনের খোলা প্রশ্নোত্তর পর্বে যারা অংশগ্রহণ করত তাদের মাধ্যমে। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে গুলেন ইজমির শহরের একটি ছাত্রাবাস কাম কোচিং সেন্টারে ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। গুলেন মুভমেন্টের প্রাথমিক উন্নয়নে এই ‘কিস্তানি পাজারি’ ছাত্রাবাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গুলেন ছিলেন একজন সরকারি ধর্ম-প্রচারক। তিনি ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি অংশ নিতেন নানা গণবক্তৃতায়। তাছাড়াও গুলেন অংশ নিতেন যেকোনো ক্যাফে-কর্নারে ও চা-চক্রের আড্ডায়। এই সকল পরিবেশে আলোচনা হতো সুশিক্ষার জন্য আবশ্যকীয় নানা অনুসঙ্গ এবং প্রয়োজনীয় নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে। আর এই আলোচনাই গুলেন ও তার চারপাশের লোকজনকে সামাজিক সামষ্টিক মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করে। এই আলোচনা ও পর্যালোচনার ফলেই পরবর্তীতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে ওঠে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। আর এই সব প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম শিক্ষাভিত্তিক; যেমন- ছাত্রাবাস, কোচিং সেন্টার, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর কলেজ প্রভৃতি। পরবর্তী সময়ে মিডিয়াভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে এই সব মিডিয়া গড়ে উঠেছিল শিক্ষা উদ্যোগের অনুবর্তন হিসেবে। আরো পরের দিকে, সমমনা ও সমপেশার লোকদের নিয়ে গড়ে ওঠে নানা পেশাজীবী, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। আশির দশকের শেষ দিকে তুরস্কে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের লালক সামরিক শক্তির লৌহশাসনের অবসান ঘটে। ঠিক একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে। মধ্যএশিয়ায় অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। এই সময় গুলেন মুভমেন্ট দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বিশেষ করে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙনের পর মধ্যএশিয়ার সকল সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশে গুলেন মুভমেন্ট তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। তুর্কি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীভুক্ত এসব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি গুলেন মুভমেন্ট আন্তঃসাংস্কৃতিক ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ শুরু করে। হান্টিংটেনের “সভ্যতার সঙ্কট” এর বিপরীতে ফেতুল্লাহ গুলেনের এই “আন্তঃধর্মীয় সংলাপ” সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। যদিও এন্টার্কটিকা ব্যতীত সব মহাদেশেই গুলেন মুভমেন্টের কাজ সম্প্রসারিত- তথাপি এর কোনো নিবন্ধিত অফিস বা ঠিকানা নেই। তুরস্কের সকল শহর ও নগরীতে গুলেন মুভমেন্টের দ্বারা অনুপ্রাণিত স্কুল কিংবা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে রয়েছে। তুরস্কের বাইরেও সকল মহাদেশ জুড়ে শত শত স্কুল ছড়িয়ে আছে। আর এ সকল স্কুল গুলেনের শান্তিপূর্ণ জীবন ও কর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত।

১৯৬০ সালে গুলেনের কতিপয় শিষ্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ২০০০ সালে লাখ লাখ মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেকেরই গুলেনের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি। এটা সত্যিই আশ্চর্যের যে, কিভাবে এটা ঘটল? গুলেন মুভমেন্ট-এর কোন বিষয় তুরস্কের জনগণকে এতটা আকৃষ্ট করল? এ ব্যাপারে জানব আগামী পর্বে। (চলবে…..)

Link: Newsevent24.com

Advertisements